
জলবায়ু সংকট তীব্রতর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবী একটি রেকর্ড-ভাঙা উত্তপ্ত বছরের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে—যা এখন প্রায় নিশ্চিত। জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এক ভয়াবহ সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত চক্র ‘এল নিনো’র আগমনের ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রার পূর্বের সব রেকর্ড আগামী ২০২৭ সালেই ভেঙে যেতে পারে।
জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন ক্রমাগত বাড়তে থাকায় তা বায়ুমণ্ডলে আরও বেশি তাপ আটকে রাখছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে চলতি সপ্তাহেই যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে রেকর্ড-ভাঙা তীব্র তাপপ্রবাহ আঘাত হেনেছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ইতোমধ্যে পৃথিবীতে প্রতি মিনিটে একজন মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। কার্বন নির্গমন দ্রুত না কমালে এই মৃত্যুর মিছিল আরও দীর্ঘ হবে।
ডব্লিউএমও প্রতিবেদনের মূল পূর্বাভাসসমূহ (২০২৬–২০৩০)
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অফিসের তৈরি ডব্লিউএমও’র বিশেষ প্রতিবেদনে আগামী পাঁচ বছরের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে:
৮৬% সম্ভাবনা: ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে যেকোনো একটি বছর ২০২৪ সালকে ছাড়িয়ে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হওয়ার সম্ভাবনা ৮৬ শতাংশ।
৭৫% সম্ভাবনা: ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের পাঁচ বছরের গড় তাপমাত্রা শিল্পপূর্ব যুগের গড়ের চেয়ে $১.৫^\circ\text{C}$ এর বেশি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৭৫ শতাংশ।
২ ডিগ্রির আশঙ্কাজনক সীমা: তবে আশার কথা হলো, জরুরি পদক্ষেপ নিলে পরবর্তী লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব। ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা শিল্পপূর্ব যুগের বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে $২^\circ\text{C}$ ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ১ শতাংশেরও কম।
আর্কটিক অঞ্চলের ভয়াবহতা: উত্তর মেরু বা আর্কটিক অঞ্চলে আগামী পাঁচটি শীতকাল সাম্প্রতিক গড়ের চেয়ে $২.৮^\circ\text{C}$ বেশি উষ্ণ হবে। অর্থাৎ, এই অঞ্চলটি বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় তিনগুণেরও বেশি দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে।
প্রশান্ত মহাসাগরে ‘সুপার এল নিনো’র আনাগোনা
‘এল নিনো’ হলো মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। প্রশান্ত মহাসাগরে বায়ুর গতিপ্রবাহের পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রে জমে থাকা তাপ বায়ুমণ্ডলে মুক্ত হয়, যা বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এনওএএ) সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী:
৯৬% সম্ভাবনা: ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে এল নিনো আসার সম্ভাবনা ৯৬ শতাংশ।
৩৫% সম্ভাবনা: একটি বিধ্বংসী ‘সুপার এল নিনো’ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে অন্তত ৩৫ শতাংশ।
ডব্লিউএমও প্রতিবেদনের প্রধান লেখক ড. লিওন হার্মান্সন বলেন, “২০২৬ সালের শেষে এই এল নিনোর পূর্বাভাসের কারণেই পরবর্তী বছর অর্থাৎ ২০২৭ সালে পৃথিবীর তাপমাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দেওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।”
ইউরোপ এবং এশিয়ার ভারতসহ বিভিন্ন অংশে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহকে জলবায়ু সংকটের ঘূর্ণায়মান প্রভাবের একটি ‘নির্মল স্মারক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক প্রধান সাইমন স্টিয়েল। তিনি বিশ্বনেতাদের উদ্দেশ্যে বলেন:
“চরম তাপ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ব্যয় থেকে মানুষের জীবন, ব্যবসা ও অর্থনীতি রক্ষা করা প্রতিটি দেশের মূল দায়িত্ব। আর এটি শুরু করতে হবে জীবাশ্ম জ্বালানির আসক্তি দ্রুত ত্যাগ করার মাধ্যমে। কারণ, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন এখন জীবাশ্ম জ্বালানির চেয়ে অনেক সস্তা এবং দ্রুত উৎপাদনযোগ্য।”
বিজ্ঞানীরা বারবার সতর্ক করেছেন যে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার $১.৫^\circ\text{C}$ পার হলে তীব্র খরা, খামখেয়ালি ঝড়, বন্যা এবং অতি-তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়, যা মানবসমাজের মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতাকে ধ্বংস করে দেয়।
আগামী পাঁচ বছরে (২০২৬–২০৩০) মে থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বৃষ্টিপাতের ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে:
অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত: উত্তর ইউরোপ, আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল, আলাস্কা ও সাইবেরিয়ায় স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভয়াবহ খরা: বিশ্বের ফুসফুস খ্যাত দক্ষিণ আমেরিকার ‘অ্যামাজন অঞ্চল’-এ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা বনাঞ্চলটিকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
মাটি ও জনতার কথা’র বিশেষ নোট: প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি $১.৫^\circ\text{C}$ এর মধ্যে সীমিত রাখার কথা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা প্রায় অসম্ভব বলেই ধরে নেওয়া হচ্ছে। উন্নত দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণের খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে। কার্বন আসক্তি না কমলে আগামী বছরগুলোতে আমাদের আরও ভয়াবহ বন্যা ও তাপদাহের মুখোমুখি হতে হবে।
| সূচক | পূর্বাভাসের হার / তীব্রতা |
| সবচেয়ে উষ্ণ বছর হওয়ার ঝুঁকি (২০২৪-এর রেকর্ড ভাঙা) | ৮৬% |
| তাপমাত্রা শিল্পপূর্ব যুগের চেয়ে $১.৫^\circ\text{C}$ বৃদ্ধি | ৭৫% |
| তাপমাত্রা শিল্পপূর্ব যুগের চেয়ে $২.০^\circ\text{C}$ বৃদ্ধি | ১% এরও কম |
| ২০২৬-২০২৭ মৌসুমে এল নিনো আসার সম্ভাবনা | ৯৬% |
| সুপার এল নিনো সৃষ্টির শঙ্কা | ৩৫% |
| আর্কটিক (উত্তর মেরু) অঞ্চলের উষ্ণায়ন গতি | বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে ৩ গুণেরও বেশি |