
নতুন এক ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। ইউরোপের কোনো দেশের বিপক্ষে তাদেরই ঘরের মাঠে প্রথমবার খেলতে নেমে অবিশ্বাস্য জয় অর্জন করে নিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। রক্ষণভাগের কিছু দুর্বলতা এবং প্রথমার্ধে গোল হজমের ধাক্কা সামলে শেষ মুহূর্তের রোমাঞ্চকর গোলে ইউরোপের দল সান ম্যারিনোকে পরাজিত করেছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।শুক্রবার অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচটিতে সান ম্যারিনোকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়েছে বাংলাদেশ। দুই সপ্তাহ আগে দায়িত্ব নেওয়া নতুন কোচ টমাস ডুলির অধীনে এটি বাংলাদেশের প্রথম এবং দুর্দান্ত এক জয়।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের তলানির দলের বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষাফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ২১১তম স্থানে থাকা একদম তলানির দল সান ম্যারিনো, যাদের চেয়ে বাংলাদেশ র্যাঙ্কিংয়ে ৩০ ধাপ এগিয়ে। তবে ইউরোপের কন্ডিশনে তাদেরই মাঠে খেলা এবং গত মার্চের দুটি ম্যাচে হারের তেতো স্বাদ পাওয়ার কারণে হামজা-জামালদের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ ছিল। সব প্রতিকূলতা জয় করে এই ঐতিহাসিক জয়টি বাংলাদেশ শিবিরে স্বস্তি ও আনন্দের বন্যা বয়ে এনেছে।ম্যাচের শুরুতে মাঝমাঠের অন্যতম বড় ভরসা শমিত সোমকে একাদশের বাইরে রেখে দল সাজিয়ে কিছুটা চমক দেন কোচ টমাস ডুলি।
প্রথমার্ধ: তপুর হেডে লিড ও রক্ষণের ভুলে সমতাতপুর প্রথম গোল (১৭তম মিনিট): ম্যাচের শুরুতে সান ম্যারিনো একটি আক্রমণ করলেও তা বাংলাদেশের ডিফেন্সে বাধা পায়। ধীরে ধীরে নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে ১৬তম মিনিটে প্রথম সুযোগ তৈরি করে বাংলাদেশ।
এর ঠিক পরেই আসে কাঙ্ক্ষিত গোল। ইংল্যান্ড প্রবাসী মিডফিল্ডার হামজা চৌধুরির ফ্রি কিক থেকে সতীর্থদের পা ঘুরে ডি-বক্সের ডান দিকে বল পান শেখ মোরসালিন। মোরসালিনের বাড়ানো দারুণ ক্রসে সম্পূর্ণ অরক্ষিত ডিফেন্ডার তপু বর্মন নিখুঁত হেডে বল জালে জড়িয়ে বাংলাদেশকে ১-০ গোলে এগিয়ে নেন।সান ম্যারিনোর সমতা (৩১তম মিনিট): ৩১তম মিনিটে রক্ষণভাগের মারাত্মক ভুলে গোল খেয়ে বসে বাংলাদেশ। ডান দিক দিয়ে আক্রমণে ওঠা স্বাগতিক ফরোয়ার্ড বেরার্দিকে আটকাতে গিয়ে স্লাইড করেন তপু, কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন। বিনা বাধায় বেরার্দি ডি-বক্সে পাস বাড়ান নিকোলাস গাকোপেত্তির উদ্দেশ্যে। সেখানে বাংলাদেশী ডিফেন্ডারদের কেউ তাঁকে চ্যালেঞ্জ না করায় প্লেসিং শটে গোল করেন গাকোপেত্তি (১-১)। এই গোলে বাংলাদেশের গোলরক্ষক মিতুল মারমারও কিছুটা দায় ছিল।
৩৬তম মিনিটে আবার এগিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন ডিফেন্ডার সাদ। ডি-বক্সে গোলরক্ষককে একা পেয়েও তিনি বল আকাশে উড়িয়ে মেরে সুযোগ নষ্ট করেন।
দ্বিতীয়ার্থ: ডুলির কৌশল ও ৮৬ মিনিটের নাটকীয়তাদ্বিতীয়ার্থের শুরুতেই একসঙ্গে তিনটি পরিবর্তন এনে শমিত সোম, জায়ান আহমেদ ও সোহেল রানাকে মাঠে নামান বাংলাদেশ কোচ। মাঠে নামার তিন মিনিটের মধ্যে গোলমুখে সতীর্থের পাস পেয়েও প্রয়োজনীয় টোকা দিতে ব্যর্থ হন সোহেল। এর চার মিনিট পর ফয়সাল আহমেদ ফাহিমের শট পোস্টে লেগে ফিরে এলে দুর্ভাগ্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়।৬১তম মিনিটে সান ম্যারিনোর কাপিচিয়োনির এক দূরপাল্লার জোরালো শট ঝাঁপিয়ে পড়ে এক হাতে রক্ষা করেন গোলরক্ষক মিতুল মারমা, যা দলকে ম্যাচ থেকে ছিটকে যেতে দেয়নি।তপুর জয়সূচক গোল (৮৬তম মিনিট): ম্যাচের শেষ দিকে দুই দলই ফাউল করতে শুরু করলে রেফারিকে বেশ কয়েকটি হলুদ কার্ড দেখাতে হয়। অবশেষে ৮৬তম মিনিটে ডেডলক ভাঙেন তপু বর্মন। এবারও উৎস ছিল হামজা চৌধুরির একটি ফ্রি কিক। ডান দিক থেকে হামজার নেওয়া ফ্রি কিকে বক্সে শট নেন বিশ্বনাথ ঘোষ। বলটি লক্ষ্যেই ছিল, তবে চলন্ত বলে মাথা ছুঁইয়ে দিক পরিবর্তন করে দেন তপু বর্মন। বল সোজা জালে জড়ালে ২-১ গোলে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ।
ম্যাচের সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান ও শেষ মুহূর্তের উত্তেজনাঘটনা/সূচকবাংলাদেশসান ম্যারিনোফলাফল২ গোল (জয়ী)১ গোলগোলদাতাতপু বর্মন (১৭' ও ৮৬')নিকোলাস গাকোপেত্তি (৩১')গোলের অ্যাসিস্টশেখ মোরসালিন ও বিশ্বনাথ ঘোষবেরার্দিফ্রি কিক কারিগরহামজা চৌধুরি (উভয় গোলের উৎস)—ম্যাচের শেষ সময়ে গোলরক্ষক মিতুল মারমা একটি সহজ শট ঠেকাতে গিয়ে হাত থেকে বল ফস্কে ফেললেও ভাগ্যবশত বলটি গোললাইন পার হয়নি। ৪ মিনিট যোগ করা সময়ের শেষ মিনিটে দুই দলের ফুটবলাররা মাঠে সামান্য বিতণ্ডায় জড়ালেও রেফারি দ্রুত পরিস্থিতি শান্ত করেন এবং শেষ বাঁশির সাথে সাথেই ইতিহাসের প্রথম ইউরোপীয় জয়ের উল্লাসে মাতে বাংলাদেশ।
ইউরোপের কন্ডিশনে গিয়ে সান ম্যারিনোকে তাদেরই মাটিতে হারানো বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য একটি বিশাল মনস্তাত্ত্বিক বিজয়। নতুন কোচ টমাস ডুলির অধীনে আক্রমণভাগে শেখ মোরসালিন, ফাহিমদের গতি এবং হামজা চৌধুরির সেট-পিস বেশ কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। তবে মধ্যমাঠ ও রক্ষণভাগের যে সমন্বয়হীনতার কারণে ৩১ মিনিটে গোল হজম করতে হয়েছে, তা নিয়ে কোচকে আরও কাজ করতে হবে।