
ক্ষণজন্মা ও জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহ্-এর মৃত্যুর দীর্ঘ ৩০ বছর পর তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য ও কারণ উদঘাটনে এক যুগান্তকারী আদেশ দিয়েছেন আদালত। সালমান শাহর মৃতদেহ (লাশ) সিলেট হযরত শাহজালাল (র.)-এর মাজার প্রাঙ্গণের কবর থেকে উত্তোলন, সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি এবং নতুন করে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা গত ২৪ মে এই আদেশ দেন। এর আগে গত ২০ মে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের পরিদর্শক জিয়াউল মোর্শেদ লাশ উত্তোলনের এই আবেদনটি করেছিলেন।
আজ বুধবার (১০ জুন) সিআইডির পরিদর্শক জিয়াউল মোর্শেদ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটনের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে প্রখ্যাত চিত্রনায়ক সালমান শাহর (চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন) মৃতদেহ কবর থেকে উত্তোলনপূর্বক সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের আবেদন জানালে আদালত তা মঞ্জুর করেন। আনুষ্ঠানিক কিছু আইনি প্রক্রিয়া শেষ করেই আমরা দ্রুত লাশ উত্তোলন ও পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করব।”
আদালতে পেশ করা সিআইডির আবেদন ও মামলা সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সালমান শাহর মা নিলুফা জামান চৌধুরী নীলা চৌধুরী, বাবা মৃত কমর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী এবং ছোট ভাই শাহরান শাহ নিউ ইস্কাটন রোডের ইস্কাটন প্লাজার ১১/বি নম্বর বাসায় সালমানের সঙ্গে দেখা করতে যান।
তখন সালমান শাহর স্ত্রী সামীরা হক এবং বাসার কর্মচারী আবুল তাঁদের জানান যে সালমান ঘুমাচ্ছেন। এরপর তাঁরা গ্রিন রোডের বাসায় চলে যাওয়ার পর, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সালমানের বাসা থেকে টেলিফোনে জানানো হয় সালমানের কী যেন হয়েছে, দ্রুত আসার জন্য।
এজহারের বিবরণ অনুযায়ী নির্মম সেই চিত্র:
স্বজনরা দ্রুত ইস্কাটনের বাসায় ফিরে শয়নকক্ষে খাটের ওপর সালমান শাহকে নিথর অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। এ সময় কয়েকজন বহিরাগত নারী তাঁর হাত-পায়ে তেল মালিশ করছিলেন এবং পাশের কক্ষে সামীরার আত্মীয় রুবি বসে ছিলেন।
সালমানের মা চিৎকার করে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার অনুরোধ জানালে তাঁরা হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নিয়ে যান। পথিমধ্যে সালমানের গলায় দড়ির দাগ এবং মুখমণ্ডল ও পায়ে নীলচে দাগ দেখতে পান স্বজনরা।
হলি ফ্যামিলি থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সালমান শাহকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর ময়নাতদন্ত শেষে সিলেটে তাঁকে দাফন করা হয় এবং তৎকালীন সময়ে রমনা থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
সালমান শাহর বাবা কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী জীবিত থাকাকালীন ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি দরখাস্ত দাখিল করে ছেলের মৃত্যুকে 'হত্যাকাণ্ড' বলে সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং অপমৃত্যু মামলাটি ৩০২ ধারায় হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন জানান। বাবার মৃত্যুর পর সালমানের মামা মোহাম্মদ আলমগীর বোনের (নীলা চৌধুরী) পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করছেন।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর, গত বছরের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক বাদী পক্ষের করা রিভিশন মঞ্জুর করে এটিকে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ২১ অক্টোবর সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর বাদী হয়ে রাজধানীর রমনা থানায় দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় একটি নিয়মিত হত্যা মামলা দায়ের করেন।
নতুন করে দায়ের করা এই দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারার হত্যা মামলায় সালমান শাহর স্ত্রীসহ দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও চলচ্চিত্রের খলনায়কদের আসামি করা হয়েছে। এজহারনামীয় আসামিরা হলেন: ১. সামীরা হক (সালমান শাহর স্ত্রী) ২. আজিজ মোহাম্মদ ভাই (শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক) ৩. লতিফা হক লুছি ৪. ডন (চলচ্চিত্রের খলনায়ক) ৫. ডেবিট ৬. জাভেদ ৭. ফারুক ৮. রুবি (মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের মালিক) ৯. আব্দুস সাত্তার ১০. সাজু ১১. রেজভি আহমেদ ফরহাদ (১৭)
মামলায় এজহারনামীয় আসামিদের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও অনেককে আসামি করা হয়েছে। মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, আসামিরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে পরস্পর যোগসাজশে সালমান শাহকে হত্যা করেছেন। তবে আইন অনুযায়ী, প্রমাণ সাপেক্ষে অভিযুক্তদের মধ্যে কেউ ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করে থাকলে, তাঁরা মামলার দায় থেকে অব্যাহতি পাবেন।সালমান শাহ্ কেবল একজন চিত্রনায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন কোটি বাঙালির আবেগের নাম। দীর্ঘ তিন দশক ধরে তাঁর মৃত্যু আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড—এই বিতর্ক দেশের আপামর জনতাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। এত বছর পর কবর থেকে লাশ উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের এই আদেশ সালমান ভক্তদের মনে নতুন করে আশার আলো জাগিয়েছে।