
লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণ উপশহর দাহিয়েহ এলাকায় এক শক্তিশালী বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। যেকোনো সম্ভাব্য দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক চুক্তির ঠিক আগমুহূর্তে বৈরুতের বুকে ইসরায়েলের এই আকস্মিক হামলার তীব্র নিন্দা জানানোর পাশাপাশি এর উপযুক্ত ও কঠোর জবাব দেওয়ার কথা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে ইরান।
গত রোববার (১৪ জুন) এক যৌথ বিবৃতিতে লেবাননে এই বিমান হামলা চালানোর তথ্য নিশ্চিত করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর (আইডিএফ) দাবি, গত কিছুদিন ধরে হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে ইসরায়েলি ভূখণ্ডে অনবরত রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হচ্ছিল। তারই পাল্টা জবাব হিসেবে বৈরুতের ঘনবসতিপূর্ণ দাহিয়েহ এলাকায় এই বিশেষ বিমান অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
আইডিএফ ও ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের দাবি:
কমান্ড সেন্টার ধ্বংস: হামলায় দাহিয়েহতে অবস্থিত হিজবুল্লাহর একটি প্রধান কমান্ড সেন্টারকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যা মূলত ইসরায়েলের সাধারণ নাগরিক ও দক্ষিণ লেবাননে মোতায়েনকৃত ইসরায়েলি সেনাদের বিরুদ্ধে হামলার মূল পরিকল্পনা তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
যোগাযোগ প্রধানের উপস্থিতি: ইসরায়েলি গণমাধ্যমের খবরে দাবি করা হয়েছে, লক্ষ্যবস্তু হওয়া ওই স্থাপনায় হিজবুল্লাহর যোগাযোগ ব্যবস্থার (Communication Head) প্রধান অবস্থান করছিলেন। তবে মার্কিন বা ইসরায়েলি বিমান হামলার ফলে তিনি নিহত বা আহত হয়েছেন কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে, আমেরিকার বিখ্যাত সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’-এর সিনিয়র সাংবাদিক বারাক রাভিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বৈরুতে এই বিধ্বংসী হামলা চালানোর ঠিক কিছুক্ষণ আগে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডকে (CENTCOM) পুরো অভিযানের বিষয়ে অগ্রিম অবহিত করেছিল ইসরায়েলি গোয়েন্দা ও সামরিক প্রশাসন।
চুক্তির আলোচনার টেবিলে বসার মুহূর্তে লেবাননে ইসরায়েলের এই আগ্রাসনে চরম ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তেহরান। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও দেশটির প্রধান পরমাণু ও রাজনৈতিক আলোচক বাঘের ঘালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
তিনি সরাসরি ওয়াশিংটনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বলেন:
“দাহিয়েহতে ইসরায়েলের এই বর্বর হামলা প্রমাণ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র হয় আন্তর্জাতিক মহলে তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিন্দুমাত্র ইচ্ছা রাখে না, নয়তো তা বাস্তবায়নের কোনো সক্ষমতাই তাদের নেই। আপনারা যদি নিজেদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিই পূরণ করতে না পারেন, তাহলে ভবিষ্যতের জন্য আলোচনার পথ খোলা রাখাও আর সম্ভব নয়।”
অন্যদিকে, ইরানের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সামরিক উপদেষ্টা ইব্রাহিম রেজাই মার্কিন প্রশাসনের উদ্দেশ্যে এক রূপক ও কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, জায়নবাদী (ইসরায়েল) শাসনকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে তবেই কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো নতুন চুক্তির পথ উন্মুক্ত হতে পারে।
একই সাথে মার্কিন ও পশ্চিমা নেতাদের সতর্ক করে তিনি বলেন:
“এই উন্মত্ত কুকুরকে (ইসরায়েল) যদি আপনারা এখনই নিয়ন্ত্রণে না আনেন, তবে আমাদের মধ্যকার সম্ভাব্য কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির কালি শুকানোর আগেই সে উল্টো আমাদের নিজেদের পায়েই কামড় বসাবে।”
মধ্যপ্রাচ্যে যখনই কোনো বড় ধরনের শান্তি চুক্তি বা যুদ্ধবিরতির আভাস পাওয়া যায়, ঠিক তখনই এই ধরনের বড় সামরিক হামলা পুরো প্রক্রিয়াকে ভেস্তে দেয়। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের সাথে ‘ঐতিহাসিক চুক্তি’র চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকার দাবি করছেন, ঠিক তার পরদিনই ওয়াশিংটনের সবুজ সংকেত নিয়ে বৈরুতে ইসরায়েলের এই হামলা ট্রাম্প প্রশাসনের সদিচ্ছাকেই বড় প্রশ্নের মুখে ফেলে দিল। ইরানের এই কড়া হুঁশিয়ারির পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।