
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দোর্দণ্ডপ্রতাপে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও র্যাবের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করা বেনজীর আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন। অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং পাসপোর্ট জালিয়াতির দুই মামলার ভিত্তিতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে ‘রেড নোটিস’ জারি করা হয়েছিল এবং সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই গত শুক্রবার দুবাই থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে দুবাই পুলিশের হেফাজতে থাকা বেনজীর আহমেদকে খুব শিগগির দেশে ফিরিয়ে আনা হবে বলে গত রোববার জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
১১ কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের উপপরিচালক হাফিজুল ইসলাম বাদী হয়ে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর বেনজীরের বিরুদ্ধে প্রথম মামলাটি দায়ের করেন। তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়া হয়।
অভিযোগপত্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
বেনজীর আহমেদ তাঁর দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে মোট ১২ কোটি ২০ লাখ ২৭ হাজার ৩৩১ টাকার সম্পদের ঘোষণা দিয়েছিলেন।
তবে দুদকের তদন্তে তাঁর নামে মোট ১৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়।
তাঁর বৈধ আয়ের নিট সঞ্চয় বাদ দেওয়ার পর, বেনজীর আহমেদ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ১১ কোটি ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৫৭৬ টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।
গত ৮ মার্চ আদালত এই অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। এরপর ৩ মে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। ইতিমধ্যে বাদীসহ ৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ২৩ জুন দিন ধার্য রয়েছে এবং তিনি পলাতক থাকায় তাঁর অনুপস্থিতিতেই এই বিচার চলছে।
বিচারাধীন মামলার পাশাপাশি বেনজীর আহমেদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুদকের আরও ৫টি মামলার তদন্ত কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে।
২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বেনজীর আহমেদ, তাঁর স্ত্রী জীশান মির্জা এবং দুই মেয়ে ফারহিন রিশতা ও তাহসিন রাইসার বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগে মামলা করে দুদক। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত ১১ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা নগদে তোলার পর তা কোথাও বিনিয়োগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ২০২৪ সালে বিভিন্ন সময়ে তাঁদের দীর্ঘদিনের এফডিআর হিসাব মেয়াদোত্তীর্ণের আগেই একযোগে তুলে নিয়ে তাঁরা দেশ ছাড়েন।
২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে বেনজীরের স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধে পৃথক ৩টি মামলা করে দুদক, যেখানে বেনজীর আহমেদকে সহযোগী আসামি করা হয়:
স্ত্রী জীশান মির্জা: তাঁর বিরুদ্ধে ৩১ কোটি ৬৯ লাখ ৫৫ হাজার ১৪৯ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও ১৬ কোটি ১ লাখ ৭১ লাখ ৩৩৬ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ।
বড় মেয়ে ফারহিন রিশতা বিনতে বেনজীর: ৮ কোটি ৭৫ লাখ ২৭৪ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ।
ছোট মেয়ে তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীর: ৫ কোটি ৫৯ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ।
সরকারি চাকরিতে (ডিআইজি, অতিরিক্ত আইজিপি, র্যাব মহাপরিচালক ও ডিএমপি কমিশনার) থেকেও নিজেকে ‘বেসরকারি চাকরিজীবী’ (প্রাইভেট সার্ভিস) দেখিয়ে বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র (এনওসি) ছাড়াই সাধারণ এমআরপি ও ই-পাসপোর্ট তৈরির অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর বেনজীরসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। এই মামলায় পাসপোর্ট অফিসের সাবেক দুই পরিচালক, একজন বর্তমান পরিচালক এবং ই-পাসপোর্ট প্রকল্পের কারিগরি ম্যানেজারকেও আসামি করা হয়েছে, যাঁরা সত্য জেনেও যোগসাজশে এই পাসপোর্ট অনুমোদন দিয়েছিলেন।
বেনজীর আহমেদ ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত র্যাবের মহাপরিচালক এবং ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে যান। অবসরের বছর দুয়েক পর সংবাদমাধ্যমে তাঁর বিপুল সম্পদের খতিয়ান প্রকাশিত হলে অনুসন্ধানে নামে দুদক।
দুদকের অনুসন্ধানে তাঁর শত শত বিঘা জমি, একাধিক ফ্ল্যাট, রিসোর্ট ও কোম্পানির শেয়ারের সন্ধান মিললে আদালতের নির্দেশে সেসব সম্পদ জব্দ ও ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করা হয়। তবে আদালতের নিষেধাজ্ঞা আসার আগেই ২০২৪ সালের ৪ মে সপরিবারে দেশ ছাড়েন তিনি। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে তাঁর বিরুদ্ধে দেশে চাঁদাবাজি, হত্যাচেষ্টা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। ক্ষমতার শীর্ষে থেকে আইনের তোয়াক্কা না করে যারা বিপুল অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, তাদের পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে—সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনাটি তারই এক জ্বলন্ত প্রমাণ। ইন্টারপোলের রেড নোটিসের কার্যকারিতা এবং সরকারের পক্ষ থেকে তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার দৃঢ় প্রত্যয় দেশের সাধারণ মানুষের মনে আইনের শাসনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনবে।