
চলমান ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপে ইরান দলের অংশগ্রহণ নিয়ে জল ঘোলা কম হয়নি। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আর ভূরাজনৈতিক জটিলতার প্রভাব সরাসরি এসে পড়েছে ফুটবলের সবুজ মাঠে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা জটিলতা, ম্যাচ শেষে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার কঠোর শর্ত এবং প্রশাসনিক হয়রানির শিকার হয়ে এবার ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন ইরানি ফুটবলার ও কোচিং স্টাফরা। লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচটি শেষ হতে না হতেই পুরো দলকে তড়িঘড়ি করে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ায় ইরানের প্রধান কোচ আমির গালেনোই আক্ষেপ করে বলেছেন, “বিশ্বকাপের সবচেয়ে ‘নিপীড়িত’ দল সম্ভবত আমরাই।”
বিশ্বকাপ শুরুর আগ থেকেই ইরান দলকে ঘিরে নানা নাটকীয়তা তৈরি হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দলটির বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া নিয়েই চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল। একপর্যায়ে মার্কিন প্রশাসন ইরানি ফুটবলারদের ভিসা দিতে পর্যন্ত অস্বীকৃতি জানায়। শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে ফুটবলার এবং ব্যাকরুমের হাতেগোনা কয়েকজন স্টাফকে ভিসা দেওয়া হলেও, ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি, গুরুত্বপূর্ণ কোচিং সাপোর্ট স্টাফ এবং মিডিয়া কর্মকর্তাদের ভিসা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে।
ইরানের পাল্টা কৌশল:
ম্যাচ সরানোর আবেদন: এই বৈষম্যের কারণে ইরান ফুটবল দল আগেই ফিফার কাছে আবেদন জানিয়েছিল যেন তাদের ম্যাচগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে মেক্সিকোয় সরিয়ে নেওয়া হয়। যদিও ফিফা সেই আবেদনে সাড়া দেয়নি।
বেজ ক্যাম্প স্থানান্তর: ফিফা রাজি না হওয়ায় ইরান তাদের মূল বেজ ক্যাম্প যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা থেকে সরিয়ে মেক্সিকোর সীমান্তবর্তী শহর তিহুয়ানায় নিয়ে যায়।
কঠোর ২৪ ঘণ্টার শর্ত: মার্কিন প্রশাসন ইরানি দলের সদস্যদের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত জুড়ে দেয় যে, ম্যাচ যেদিন খেলা হবে, তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তাদের যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড ত্যাগ করতে হবে।
গত সোমবার রাতে ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছিল ইরান। ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হয়। কিন্তু ম্যাচ রেফারি শেষ বাঁশি বাজানোর পরপরই শুরু হয় মাঠের বাইরের আসল ধকল। নিয়মানুযায়ী ম্যাচ শেষে খেলোয়াড়দের শরীর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য (রিকভারি প্রসেস) ওই রাতেই ক্যালিফোর্নিয়াতে থাকার পরিকল্পনা ছিল দলটির। কিন্তু মার্কিন প্রশাসনের কড়া নির্দেশে ম্যাচ শেষ হতেই পুরো দলকে দ্রুত বিমানযোগে মেক্সিকোর তিহুয়ানার ক্যাম্পে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়।এই খামখেয়ালি ও অমানবিক সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করে প্রধান কোচ আমির গালেনোই বলেন: “তারা আমাদের ন্যূনতম পুনরুদ্ধারের (রিকভারি) সময়টুকও দেয়নি। ম্যাচ শেষেই বলা হলো, আপনাদের এখনই চলে যেতে হবে। একটি ৯০ মিনিটের হাই-ভোল্টেজ ম্যাচের পর খেলোয়াড়দের বিশ্রাম ও পেশির রিকভারি কতটা জরুরি, তা সবাই জানে। কিন্তু আমাদের জোর করে বিমানে তুলে ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হচ্ছে, যা আমাদের জন্য বড় সমস্যা।”
কার নির্দেশে এই অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা স্পষ্ট না করলেও কোচ যোগ করেন, “আমাদের পরিকল্পনা অন্য কেউ করছে, আমাদের সিদ্ধান্ত অন্য কোথাও থেকে নেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনা ছিল ম্যাচের দুই দিন আগে আসব এবং পরের রাতটা এখানে থেকে পরদিন দুপুরে ক্যাম্পে ফিরব।”
প্রশাসনিক এত ঝামেলার মধ্যেও মাঠের খেলায় কিন্তু ইরান দারুণ লড়াই করেছে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে দুই-দুইবার পিছিয়ে পড়েও দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ায় এশিয়ান পরাশক্তিরা। ম্যাচের ৬৪ মিনিটে মোহাম্মদ মোহেব্বির নজরকাড়া গোলে শেষ পর্যন্ত ২-২ সমতায় ম্যাচ শেষ করে তারা।
সোফি স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে উপস্থিত সিংহভাগ দর্শকই ছিলেন ইরানের সমর্থক। তবে এর মধ্যেও একদল ইরানি-আমেরিকান দর্শকদের গ্যালারিতে নিজ দেশের সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যানার নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে দেখা গেছে।
দলের অধিনায়ক মেহদি তারেমি ফিফার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, “আমাদের এখনই লস অ্যাঞ্জেলেস ছাড়তে হচ্ছে, যা দলের জন্য মোটেও ভালো কিছু নয়। দলের মূল স্টাফরা ভিসা না পাওয়ায় আমাদের প্রস্তুতি আগেই ব্যাহত হয়েছে। ফিফার উচিত ছিল আমাদের আরও বেশি প্রটেকশন ও সহায়তা দেওয়া। সত্যি বলতে, পুরো পরিস্থিতিটাই আমাদের জন্য একটা দুর্যোগের মতো।”
গ্রুপ পর্বের পরবর্তী ম্যাচেও ইরানকে এই একই ভেন্যু—লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়ামেই মাঠে নামতে হবে। আগামী রোববার গ্রুপ পর্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ভাগ্যনির্ধারক ম্যাচে শক্তিশালী বেলজিয়ামের মুখোমুখি হবে গালেনোইর শিষ্যরা। তবে বুট জোড়া পায়ে মাঠের লড়াইয়ে নামার আগে, মাঠের বাইরের এই ভিসা জটিলতা, যাতায়াতের ক্লান্তি আর মানসিক চাপ ইরান দলের জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফুটবলকে বলা হয় বিশ্বজনীন খেলা, যেখানে রাজনীতি বা সীমানার প্রাচীর থাকার কথা নয়। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে ইরান দলের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের এই আচরণ ক্রীড়াঙ্গনের চেতনাকে ক্ষুণ্ন করে। মাঠের লড়াই শুরুর আগেই যাদেরকে মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, সেই ইরান দল বেলজিয়ামের বিপক্ষে কতটুকু ঘুরে দাঁড়াতে পারে, এখন সেটাই দেখার বিষয়। ‘মাটি ও জনতার কথা’ আশা করে, মাঠের বাইরের বৈষম্য ভুলে ফুটবলাররা ফুটবল দিয়েই এর যোগ্য জবাব দেবেন।