
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (বিশেষ করে ফেসবুক ও ইউটিউব) ব্যবহারের ব্যাপারে চরম কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কটূক্তি, অপপ্রচার এবং আপত্তিকর পোস্ট ছড়ানোর বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
বার্তা অনুযায়ী, যেসব শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন, তাদের দ্রুত চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে বিভাগীয় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখা থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) জারি করা এক জরুরি নির্দেশনায় এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়।
অধিদপ্তরের নির্দেশনায় স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কর্তৃক প্রণীত ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা-২০১৯ (পরিমার্জিত সংস্করণ)’ অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করা সব সরকারি কর্মচারীর জন্য আইনিভাবে বাধ্যতামূলক।
কর্তৃপক্ষ গভীর উদ্বেগের সাথে জানিয়েছে:
নীতিমালা লঙ্ঘন: সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন সব পোস্ট, ট্রল ও নেতিবাচক মন্তব্য করছেন, যা সরাসরি এই রাষ্ট্রীয় নির্দেশিকার পরিপন্থি।
ভাবমূর্তি সংকট: এসব আপত্তিকর পোস্ট ও কার্যক্রমের মাধ্যমে সামগ্রিক প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং খোদ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
নির্দেশনায় আরও উল্লেখ করা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকার, সরকারি দপ্তর কিংবা সরকারের যেকোনো নীতিগত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কটূক্তি করা, অপপ্রচার চালানো, বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো বা আপত্তিকর পোস্ট দেওয়া এবং অন্যের দেওয়া সেসব পোস্ট নিজের ওয়ালে শেয়ার করাও সরকারি চাকরির কঠোর আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে ‘সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা, ২০১৮’ অনুযায়ী সরাসরি ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য করে চাকরিগত শাস্তি দেওয়া হবে।
শিক্ষকদের এই কার্যক্রমের ওপর নজরদারি রাখতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষ মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিটির প্রতি কড়া নির্দেশনা: এসব মনিটরিং কমিটিকে প্রতি মাসে অন্তত একটি বাধ্যতামূলক সভা করতে হবে। সভায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষকদের দৈনন্দিন অনলাইন কার্যক্রম পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করতে হবে এবং কোনো অনিয়ম পেলেই দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
অধিদপ্তরের নির্দেশনায় দেশের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রতি নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, যেসব শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের কটূক্তি ও অপপ্রচার চালাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো রকম বিলম্ব না করে দ্রুত বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একইসঙ্গে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো, তার বিস্তারিত লিখিত প্রতিবেদন অধিদপ্তরে পাঠানোর জন্য বিভাগীয় উপপরিচালক, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং উপজেলা বা থানা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের অনুরোধ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) মাহবুবা আইরিন স্বাক্ষরিত একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি দেশের সব বিভাগীয় উপপরিচালক, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, পিটিআই (PTI) সুপারিনটেনডেন্ট এবং উপজেলা ও থানা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের কাছে জরুরি তামিলের জন্য পাঠানো হয়েছে।
শিক্ষকেরা হলেন সমাজের দর্পণ এবং মানুষ গড়ার কারিগর। ডিজিটাল যুগে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেকোনো যৌক্তিক সমালোচনা করার নাগরিক অধিকার সবার থাকলেও, সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে আচরণবিধি ও রাষ্ট্রীয় নির্দেশিকা মেনে চলাও সমানভাবে বাধ্যতামূলক। তবে শিক্ষকদের স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার এবং অপপ্রচারের মধ্যকার সূক্ষ্ম রেখাটি মনিটরিং কমিটিকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে মূল্যায়ন করতে হবে, যেন কোনো শিক্ষক অন্যায়ভাবে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার শিকার না হন।