
দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারি গুদামগুলোতে খাদ্যশস্যের মজুত অত্যন্ত সন্তোষজনক ও নিরাপদ অবস্থায় রয়েছে। খাদ্য অধিদপ্তরের দৈনন্দিন খাদ্যশস্য পরিস্থিতি সংক্রান্ত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৭ জুন ২০২৬ পর্যন্ত ফ্লোটিং (ভাসমান) মজুতসহ দেশে খাদ্যশস্যের মোট সরকারি মজুতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ৬০ হাজার ৫০৭ মেট্রিক টন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানের এই মজুত দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখতে এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি গুদামগুলোতে ফ্লোটিং বা ভাসমান মজুত বাদে মোট মূল মজুতের পরিমাণ ২০ লাখ ৩৮ হাজার ১১৪ মেট্রিক টন। এর সাথে গমের ২০ হাজার ৪৩২ মেট্রিক টন এবং চালের ১ হাজার ৯৬২ মেট্রিক টনের ফ্লোটিং মজুত যুক্ত হয়ে সর্বমোট মজুত ২০ লাখ ৬০ হাজার ৫০৭ মেট্রিক টনে পৌঁছেছে। খাতভিত্তিক বর্তমান মজুত পরিস্থিতি:
চালের মজুত: গুদামগুলোতে বর্তমানে প্রধান খাদ্যশস্য চালের মজুত রয়েছে ১৫ লাখ ৯৬ হাজার ৫৭৯ মেট্রিক টন।
গমের মজুত: ওম ও আটার চাহিদা মেটাতে গমের মজুত রয়েছে ৩ লাখ ৩৬6 হাজার ৮৩১ মেট্রিক টন।
ধানের মজুত: সরকারি গুদামে বর্তমানে ধান মজুত রয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৮৪ মেট্রিক টন (উল্লেখ্য, ধানের এই পরিমাণকে চালের আকারে রূপান্তর করেই মোট মজুতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়)।
চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে দেশব্যাপী বোরো সংগ্রহ অভিযান পুরোদমে চলছে। গত ৩ মে থেকে শুরু হওয়া এই সংগ্রহ অভিযান আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলবে। এই সময়ে সরকার ৫ লাখ মেট্রিক টন ধান, ১২ লাখ মেট্রিক টন চাল, ১ লাখ মেট্রিক টন আতপ চাল এবং ৫০ হাজার মেট্রিক টন গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
১৭ জুন ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত সর্বমোট ৭ লাখ ১৮ হাজার ৩৭৩ মেট্রিক টন বোরো খাদ্যশস্য সংগ্রহ সম্পন্ন হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে:
ধান: ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৭৫ মেট্রিক টন (১০০:৬৫ অনুপাতে চালের আকারে হিসাবভুক্ত)।চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই ২০base৫ থেকে ১৭ জুন ২০২৬ পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে মোট ৮৫ লাখ ৮৩ ax হাজার ৫১ টন খাদ্যশস্য আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে চাল ৭৩ লাখ ১৬ হাজার ১৯৪ টন এবং গম ১২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৭ টন।
খাতভিত্তিক আমদানির চিত্র:
সরকারি ব্যবস্থাপনা (জিটুজি ও আন্তর্জাতিক টেন্ডার): মোট ১২ লাখ ৬৬ হাজার ৯৮ টন খাদ্যশস্য আমদানি করা হয়েছে (চাল ৫ লাখ ৩১ হাজার ৮০ টন এবং গম ৭ লাখ ৩৫ হাজার ১৮ টন)।
বেসরকারি খাত (বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য): মোট ৭৩ লাখ ১৬ হাজার ৫৩ টন খাদ্যশস্য আমদানি করা হয়েছে, যার সিংহভাগই চাল (৬৫ লাখ ৮১ হাজার ৭৬ টন) এবং গম ৭ লাখ ৩৪ হাজার ৭৭ টন।
দৈনিক আমদানি: শুধু গত ১৭ জুন ২০২৬ তারিখে দৈনিক আমদানির পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ১২০ টন। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ২ হাজার ৯০ টন চাল এবং ৩ হাজার ৩০ টন গম ইতোমধ্যে দেশে এসে পৌঁছেছে। উল্লেখ্য, চলতি অর্থবছরে খাদ্য সাহায্য হিসেবে কোনো চাল বা গম আমদানি করতে হয়নি।
মোহাম্মদ মামুন মিয়া (উপ সচিব, অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ শাখা, খাদ্য মন্ত্রণালয়):
"সাধারণত দেশে ১৩ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন খাদ্য মজুত থাকলে তা নিরাপদ মজুত হিসেবে গণ্য হয়। সে হিসেবে এখন দেশে ২০ লাখ টনেরও বেশি মজুত আছে, যা অত্যন্ত নিরাপদ ও সন্তোষজনক।"
মো. জামাল হোসেন (অতিরিক্ত মহাপরিচালক -চলতি দায়িত্ব, খাদ্য অধিদপ্তর):
"সরকার যেসব লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে, তা বাস্তবায়নে আমরা মাঠপর্যায়ে নিরলসভাবে কাজ করছি। আমাদের বর্তমান খাদ্য মজুত পরিস্থিতি খুবই আশাব্যাঞ্জক।"
আবু তাহের মো. মাসুদ রানা (সচিব, খাদ্য মন্ত্রণালয়):
"চলতি বোরো মৌসুমে নতুন ধান ও চাল সংগ্রহের প্রক্রিয়া পুরোদমে চলমান থাকায় আগামী দিনগুলোতে এই মজুতের পরিমাণ আরও বাড়বে। অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ এবং আমদানি প্রক্রিয়া স্বাভাবিক থাকায় বাজারে চাল ও গমের সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্থিতিশীল থাকবে।"
আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে ২০ লাখ টনের বেশি খাদ্যশস্যের মজুত নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য বড় একটি স্বস্তির খবর। তবে সরকারি গুদামে এই পর্যাপ্ত মজুত থাকার সুফল যেন সাধারণ ভোক্তারাও বাজারে পান, তা নিশ্চিত করা জরুরি। চালের দাম নিয়ে মিলার ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজি রোধ করতে পারলে এই বাম্পার মজুত দেশের খাদ্য সুরক্ষায় পুরোপুরি সফল হবে।