
মালয়েশিয়া ও চীন মিলিয়ে টানা ছয় দিনের অত্যন্ত সফল ও ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় সফর শেষে দেশের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আজ শুক্রবার (২৬ জুন) স্থানীয় সময় বিকেল সোয়া ৫টায় (বাংলাদেশ সময় সোয়া ৩টা) চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্সের একটি নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইটে সরকারপ্রধান ও তাঁর সফরসঙ্গীরা চীনের বেইজিং তাসিং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করেন। সরাসরি চলাচলকারী এই ফ্লাইটে বেইজিং থেকে ঢাকা পৌঁছাতে সাধারণত প্রায় পাঁচ ঘণ্টার মতো সময় লাগে। সেই হিসাবে বাংলাদেশ সময় আজ রাত সোয়া ৮টার দিকে প্রধানমন্ত্রীর বহনকারী বিমানটির হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের কথা রয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘তিয়াওইউথাই’ থেকে মোটর শোভাযাত্রা সহকারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর সফরসঙ্গীরা স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটে বেইজিংয়ের তাসিং বিমানবন্দরে পৌঁছান। বিমানবন্দরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ বিদায় জানান চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বিশেষ দূত ইউ শিয়াওয়ং।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান গাড়ি থেকে নামার পর বিমানবন্দরজুড়ে বিছানো রাজকীয় লাল গালিচায় হেঁটে বিমানের দিকে অগ্রসর হন। এ সময় চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলঅ্যা) একটি সুসজ্জিত চৌকস দল প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় কায়দায় সশ্রদ্ধ 'গার্ড অব অনার' প্রদান করে।
সফরের শেষ দিনটি ছিল প্রধানমন্ত্রীর জন্য অত্যন্ত ব্যস্ত ও কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
শি জিনপিংয়ের সাথে শীর্ষ বৈঠক: আজ স্থানীয় সময় সকাল পৌনে ১১টায় বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ৫০ মিনিটের একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিপক্ষীয় উচ্চপর্যায়ের এই আলোচনার পর দুই দেশের শীর্ষ নেতার মধ্যে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ফলপ্রসূ একান্ত (ওয়ান-টু-ওয়ান) বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়।
তিয়েনআনমেন স্কয়ার ও সিপিসি জাদুঘর: দ্বিপক্ষীয় ও একান্ত বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) ঐতিহ্যবাহী জাদুঘর পরিদর্শন করেন। এর আগে, আজ সকাল সোয়া ৯টায় সফরসঙ্গীদের নিয়ে ঐতিহাসিক তিয়েনআনমেন স্কয়ারে যান প্রধানমন্ত্রী এবং চীনের বীরদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।
ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস প্রধানের সাথে সাক্ষাৎ: শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তিনি চীনের আইনসভার সর্বোচ্চ সংস্থা 'ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস'-এর স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান চাও ল্যচি’র সঙ্গে এক দ্বিপক্ষীয় সৌজন্য সাক্ষাৎ ও আনুষ্ঠানিক বৈঠকে অংশ নেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও ঐতিহাসিক জয় পেয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের এটিই ছিল প্রথম বিদেশ সফর। গত ২১ জুন প্রথম দেশ হিসেবে তিনি মালয়েশিয়া সফরে যান।
মালয়েশিয়া অংশ (২১-২২ জুন): মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথে একান্ত ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদার করতে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) সই হয়। এছাড়া সন্ত্রাসবাদ দমন বিষয়ে যৌথ গবেষণা, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ সংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল বিনিময় করে ঢাকা ও কুয়ালালামপুর।
চীন অংশ (২২-২৬ জুন): গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী সরাসরি চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর দালিয়ানে পৌঁছান। সেখানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (WEF) বার্ষিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ ও কাজাখস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানের সাথে সাইডলাইন বৈঠক শেষে বুধবার বিকেলে বুলেট ট্রেনে বেইজিং পৌঁছান। বৃহস্পতিবার গ্রেট হলে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিনিয়োগ ও গণমাধ্যম সহযোগিতাসহ ১৩টি বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক সই হয়। এছাড়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি) নিজেদের মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বাড়াতে আরেকটি বিশেষ সমঝোতা স্মারক সই করে। সবমিলিয়ে এই বেইজিং সফরে ঢাকার সাথে বেইজিংয়ের মোট ১৭টি দ্বিপক্ষীয় দলিল ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
নতুন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়া ও চীন নির্বাচন অত্যন্ত দূরদর্শী ও সময়োপযোগী কূটনৈতিক পদক্ষেপ। বিশেষ করে চীনের মতো বৈশ্বিক পরাশক্তির পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের দেওয়া রাজকীয় অভ্যর্থনা, তোপধ্বনি এবং সরাসরি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে সাধারণ যাত্রীদের সাথে ভ্রমণ করা প্রধানমন্ত্রীর সাধারণ জীবনযাপনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বহন করে। এই সফরের মাধ্যমে সই হওয়া ১৭টি সমঝোতা স্মারক ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের সরাসরি মধ্যস্থতার আশ্বাস দেশের অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তায় এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে।