
একীভূত হওয়া শরীয়াহ্ভিত্তিক পাঁচ ব্যাংকের লাখ লাখ আমানতকারীদের কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত দেওয়া নিয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট পথনকশা ও অবস্থান পরিষ্কার করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সাথে তীব্র সমালোচনার মুখে বহুল আলোচিত ‘ব্যাংক রেজুলিউশন আইন, ২০২৬’-এর বিতর্কিত ১৮(ক) ধারাটি পুরোপুরি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
গত সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাগুলো দেন।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, “সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত আমানতের সুরক্ষা ও তা রক্ষা করাই বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য। অন্তর্বর্তী সরকারের করা অধ্যাদেশের পর একীভূত হওয়া পাঁচ ইসলামী ব্যাংক (ফার্স্ট সিকিউরিটি, গ্লোবাল ইসলামী, সোশ্যাল ইসলামী, ইউনিয়ন ও এক্সিম ব্যাংক) নিয়ে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর ব্যক্তিগত আমানতকারীরা তাদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে আপাতত সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত তুলতে পারবেন।”
একই সঙ্গে সাধারণ গ্রাহকদের ডিপোজিট পেনশন স্কিম বা ডিপিএস (DPS) হিসাবের ক্ষেত্রেও ২ লাখ টাকা পর্যন্ত তাৎক্ষণিক উত্তোলনের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। হিসাবের অবশিষ্ট টাকা পরবর্তীতে ধাপে ধাপে গ্রাহকদের ফেরত দেওয়া হবে বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।
সাধারণ গ্রাহকদের জন্য ২ লাখ টাকার সীমা নির্ধারণ করা হলেও বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে আমানতকারীদের জন্য বড় ছাড়ের ব্যবস্থা রেখেছে সরকার। অর্থমন্ত্রী জানান, কিডনি ডায়ালাইসিস, ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল ও ব্যয়বহুল রোগে আক্রান্ত আমানতকারী এবং যারা হজের উদ্দেশ্যে টাকা সঞ্চয় করেছিলেন, তাদের জন্য বিশেষ মানবিক ছাড়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তারা প্রয়োজনীয় প্রমাণ সাপেক্ষে চিকিৎসার ও হজের জন্য অধিক টাকা উত্তোলন করতে পারবেন।
বাজেট আলোচনায় সব মহলের নজর ছিল ‘ব্যাংক রেজুলিউশন আইন, ২০২৬’-এর ওপর। আইনটি পাসের ঠিক আগমুহূর্তে যুক্ত করা বিতর্কিত ১৮(ক) ধারাটি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল সংসদের বিরোধী দল, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। এই ধারার ফলে ব্যাংক লুটপাটে অভিযুক্ত এস আলমসহ সাবেক বিতর্কিত মালিকদের আবারও ব্যাংকের মালিকানায় ফেরার আইনি সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
সার্বিক পরিস্থিতি এবং জনস্বার্থ বিবেচনা করে সরকার এই বিতর্কিত ধারাটি আইন থেকে পুরোপুরি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন:
"বিভিন্ন অংশীজনের মতামত ও উদ্বেগের ভিত্তিতে সরকার ১৮(ক) ধারাটি বিলোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমাদের বার্তা একদম স্পষ্ট—যারা জনগণের সম্পদ লুট করেছে, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে আমানতকারীদের অর্থের শতভাগ সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।"
এস আলমের কবজায় থাকা ব্যাংকগুলোর নজিরবিহীন লুটপাটের পর সাধারণ আমানতকারীরা যখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছিলেন, তখন সরকারের ২ লাখ টাকা পর্যন্ত তাৎক্ষণিক উত্তোলনের এই সিদ্ধান্ত অন্তর্বর্তীকালীন স্বস্তি দেবে। তবে সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর হলো ১৮(ক) ধারা বাতিলের সিদ্ধান্ত। চোরের খনিকে আইনি রূপ দিয়ে ব্যাংক লুটেরাদের আবার মালিকানায় ফিরিয়ে আনার যে অপচেষ্টা পর্দার আড়াল থেকে করা হয়েছিল, তীব্র জনমত ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তা ভেস্তে গেল। একীভূত ব্যাংকের পাচার হওয়া অর্থ আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তায় ফিরিয়ে এনে গ্রাহকদের বাকি টাকা যত দ্রুত সম্ভব বুঝিয়ে দেওয়া এবং লুটেরাদের বিচার নিশ্চিত করাই এখন সরকারের আসল চ্যালেঞ্জ।