
দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যমান সব সমস্যা দ্রুত সমাধান এবং এসব সংস্থাকে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করতে ৩ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কমিটিকে আগামী ১ মাসের মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে সমাধানযোগ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে সুপারিশসহ চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আজ সোমবার (৬ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৩টায় বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বিশেষ সভায় প্রধানমন্ত্রী এই নির্দেশনা দেন।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় গঠিত এই বিশেষ কমিটিতে অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে দেশের শীর্ষ ৩ প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারক ব্যক্তিত্বকে: ১. ইসমাইল জবিউল্লাহ – প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা। ২. আব্দুল বারী – জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী। ৩. ড. নাসিমুল গনি – মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই এবং সিটি কর্পোরেশনসহ মাঠপর্যায়ে ভেজাল বিরোধী অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) পরিচালনাকারী শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মতবিনিময়কালে কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা ও সংকটের কথা প্রধানমন্ত্রীর সামনে সরাসরি তুলে ধরেন। তারা জেলাপর্যায়ে জরুরি ভিত্তিতে জনবল বাড়ানো, আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবরেটরি স্থাপন এবং আধুনিক ইকুইপমেন্ট সরবরাহের দাবি জানান। একই সাথে বিভিন্ন বাজার সিন্ডিকেট ও প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যেতে গিয়ে অনেক সময় কর্মকর্তারা মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েন উল্লেখ করে, সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার ও মোবাইল কোর্টের আইনি ক্ষমতা বহুগুণ বাড়ানোর জোর দাবি জানান।
প্রধানমন্ত্রী কর্মকর্তাদের সব সংকটের কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে শোনেন এবং তা দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়ে এই উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেন।
সভায় কর্মকর্তাদের উদ্দেশে এক দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন:
“সমস্যা থাকবেই। তারপরও সেই সমস্যার মধ্য দিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে, বসে থাকলে চলবে না। পৃথিবীর অনেক দেশ একসময় আমাদের চেয়েও অনুন্নত ছিল, অথচ আজ তারা অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আমাদেরও এগিয়ে যেতে হবে। সবাই একসঙ্গে আন্তরিকভাবে কাজ করলে সেটি অবশ্যই সম্ভব। দেশের স্বার্থে সবাইকে আরও দায়িত্বশীল ও সচেতন হতে হবে।”
জনসচেতনতার গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী ঢাকার গুলশান লেকের উদাহরণ টেনে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের অনেক লেকই আজ আবর্জনায় ভরে যাচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব আবর্জনা সমাজের শিক্ষিত মানুষরাই ফেলছেন। যাদের সচেতন হওয়ার কথা, অনেক সময় তারাই অসচেতনতা দেখান। দেশকে পরিবর্তন করতে হলে শুধু সরকারের একার উদ্যোগ নয়, নাগরিকদেরও সদিচ্ছা ও দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন।”
সভায় অন্যান্যদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আব্দুস সাত্তার, বাণিজ্য সচিব আতাউর রহমান খান, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এবং বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হক উপস্থিত ছিলেন।
মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলছে, সেই ভেজাল কারবারি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে লড়াই করা দেশের কর্মকর্তাদের জন্য এখন এক বড় যুদ্ধ। বিএসটিআই বা ভোক্তা অধিকারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের পর বছর ধরে জনবল সংকট আর সীমিত আইনি ক্ষমতার কারণে বড় বড় কারখানার মালিক ও রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের সামনে অসহায় বোধ করে আসছে। প্রধানমন্ত্রী নিজে এই সংকটের দায়িত্ব নেওয়া এবং ১ মাসের ডেডলাইন দিয়ে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা এক অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। আমরা আশা করি, এই কমিটির সুপারিশের মাধ্যমে মোবাইল কোর্টের ক্ষমতা এমনভাবে বাড়ানো হবে, যেন কোনো প্রভাবশালী সিন্ডিকেটই পার না পায়। একই সাথে শিক্ষিত নাগরিকদেরও নিজেদের স্বভাব পরিবর্তন করে ভেজাল মুক্ত দেশ গঠনে সচেতন হতে হবে।