
মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বেজে উঠেছে পুরোদস্তুর যুদ্ধের দামামা। বিশ্বরাজনীতির সমস্ত হিসাব-নিকাশ ও সাময়িক যুদ্ধবিরতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবারও এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাতের মুখে পড়েছে ইরান। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল নিয়ে চলমান উত্তেজনার জেরে ইরানের অন্তত ৮০টি সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় মার্কিন বিমান বাহিনী বিমান হামলা চালালে এই নতুন যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। এর জবাবে প্রচণ্ড ফুঁসে উঠে মধ্যপ্রাচ্যের দুই প্রধান দেশে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন ও শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে বড় ধরনের কাউন্টার অ্যাটাক বা পাল্টা আঘাত হেনেছে তেহরান।
আজ বুধবার (৮ জুলাই) কাতারভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক জরুরি প্রতিবেদনে এই যুদ্ধাবস্থার চাঞ্চল্যকর তথ্য জানানো হয়েছে।
ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ (IRGC) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মার্কিন আগ্রাসনের জবাবে তাদের নৌ ও বিমান বাহিনী একযোগে আমেরিকার ৮৫টি সুনির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্যবস্তুকে নিশানা করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। মার্কিন পঞ্চম নৌবহর ও বিমান বাহিনীকে লক্ষ্য করে চালানো এই হামলাগুলো অত্যন্ত সফল হয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান।
আইআরজিসি স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তাদের ছিটানো ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সরাসরি আঘাত হেনেছে: ১. বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত ‘পঞ্চম নৌবহর’ (US Fifth Fleet)-এর মূল ঘাঁটিতে। ২. কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন বিমান বাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটি ‘আলি আল-সালেম বিমান ঘাঁটি’ (Ali Al-Salem Air Base)-এ।
এর আগে গত মঙ্গলবার (৭ জুলাই) ইরানের হরমোজগান ও মাহশাহরের উপকূলীয় অঞ্চলে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি এবং বেসামরিক জনবসতি এলাকায় মার্কিন যুদ্ধবিমান ও ক্রুজ মিসাইল দিয়ে অতর্কিত বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। মূলত এই হামলার জবাবেই ইরান এই তীব্র সামরিক অভিযান শুরু করেছে।
ইরান দাবি করেছে, ওয়াশিংটন এই হামলার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যকার চলমান যুদ্ধবিরতি এবং অতি সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘ইসলামাবাদ চুক্তি’র শর্তাবলি চরমভাবে লঙ্ঘন করেছে। আইআরজিসি আরও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছে, মার্কিন এই বর্বরোচিত হামলাগুলো মূলত ইরানের সদ্যপ্রয়াত সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির চলমান রাষ্ট্রীয় জানাজা, ৭ দিনের শোকযাত্রা এবং দাফন প্রক্রিয়ার সময়কালকে কেন্দ্র করে করা হয়েছে। ওয়াশিংটন মূলত ইরানের এই আবেগঘন ঐতিহাসিক ঘটনা ও প্রতিরোধ আন্দোলনকে বিশ্বের বুকে ম্লান ও দুর্বল করার জন্যই দাফনের মাঝপথে এই কাপুরুষোচিত হামলা চালিয়েছে।
এদিকে ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ড ‘খাতাম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর’ থেকে মার্কিন প্রশাসনকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে এক বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম মূল ধমনী হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ এবং তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর যাতায়াতের জন্য একমাত্র নিরাপদ পথ হলো ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান কর্তৃক নির্ধারিত আইনি রুট বা নৌপথ।
সামরিক কমান্ডটি অত্যন্ত কঠোর সুরে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই আন্তর্জাতিক নৌপথের ওপর ওয়াশিংটনের কোনো ধরনের খবরদারি, সামরিক আধিপত্য বা বেআইনি হস্তক্ষেপের প্রচেষ্টা তেহরান ‘কোনো অবস্থাতেই’ মেনে নেবে না। ইরানে এ ধরনের হামলা চালানোর মাধ্যমে গত মাসে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (MoU) অধীনে থাকা ‘পারস্পরিক অঙ্গীকারের প্রতি সম্পূর্ণ অবজ্ঞা’ ও বিশ্বাসঘাতকতা প্রকাশ করেছে হোয়াইট হাউস। ইরানি সামরিক কমান্ডের হুঁশিয়ারি, এই প্রকাশ্য ‘আমেরিকান সন্ত্রাসবাদের’ দাঁতভাঙা জবাব না দিয়ে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।
আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর প্রায় চার মাস ধরে চলা সামরিক উত্তেজনার মাঝে যখন ১ সপ্তাহের জন্য একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি দেওয়া হয়েছিল, তখন সবাই ভেবেছিল মধ্যপ্রাচ্য হয়তো বড় ধরনের যুদ্ধ থেকে বেঁচে গেল। কিন্তু খামেনির মরদেহ যখন তেহরান-কোম হয়ে ইরাকের নাজাফ-কারবালা ও মাশহাদের দিকে এগোচ্ছে, ঠিক তখনই হরমুজ প্রণালির দখল নিয়ে আমেরিকার এই ৮০টি স্থাপনায় হামলা এবং জবাবে বাহরাইন ও কুয়েতের মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বৃষ্টি পুরো পরিস্থিতিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সবচেয়ে বড় সংকটের দিকে ঠেলে দিল। 'মাটি ও জনতার কথা' মনে করে, কুয়েত ও বাহরাইনে সরাসরি মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানার মাধ্যমে ইরান প্রমাণ করেছে যে, তারা ওয়াশিংটনের যেকোনো বড় ধরনের আগ্রাসন মোকাবিলায় শতভাগ প্রস্তুত। এই মুহূর্তে বিশ্ব পরাশক্তি ও জাতিসংঘ যদি অবিলম্বে হস্তক্ষেপ না করে, তবে হরমুজ প্রণালির এই বারুদ পুরো বিশ্বের জ্বালানি বাজার ও অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেবে।