
টানা ভারী বর্ষণ, ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং পাহাড়ধসে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি জেলার বন্যা পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর ও সংকটাপন্ন রূপ ধারণ করেছে। একের পর এক জনপদ তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এবার যুক্ত হয়েছে লাশের মিছিল। এখন পর্যন্ত বন্যা ও পাহাড়ধস সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১ জনে। একই সাথে আহত হয়েছেন আরও ৩৯ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ও মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে পর্যটন নগরী কক্সবাজার জেলায়।
আজ রোববার (১২ জুলাই) দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত দেশের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির হালনাগাদ সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, দেশের তিনটি অঞ্চলের—খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার মোট ৫৮টি উপজেলা, ৩৮৬টি ইউনিয়ন এবং ১১টি পৌরসভা বর্তমানে বন্যার পানিতে সম্পূর্ণ বা আংশিক প্লাবিত হয়েছে।
সরকারি হিসাবে, এ পর্যন্ত পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ। আর সম্পূর্ণ জলমগ্ন হয়ে ঘরবাড়িতে অবরুদ্ধ বা পানিবন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবারের লাখ লাখ সদস্য। দুর্গত এলাকার মানুষের জীবন বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে এই মুহূর্ত পর্যন্ত আশ্রয় নিয়েছেন ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন বিপন্ন মানুষ।
জেলাভিত্তিক প্রাণহানির হিসাবে দেশের সবচেয়ে রক্তাক্ত ও ট্রাজিক জনপদে পরিণত হয়েছে কক্সবাজার। পাহাড়ধস ও ঢলের পানিতে ভেসে গিয়ে জেলাটিতে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতের এই সংখ্যার মধ্যে ১৫ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আশ্রয়হীন শরণার্থী। এ ছাড়া জেলাটিতে আহত হয়েছেন ২৪ জন এবং এখনো ১ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
অন্যান্য জেলার মধ্যে চট্টগ্রামে পাহাড়ধস ও বন্যায় মারা গেছেন ১৩ জন, পাহাড়বেষ্টিত বান্দরবানে ৬ জন, রাঙামাটিতে ৩ জন এবং সিলেটের মৌলভীবাজারে ১ জন।
এদিকে প্রাণহানি কক্সবাজারে বেশি হলেও সবচেয়ে বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন চট্টগ্রাম জেলায়। চট্টগ্রামের ১৬টি উপজেলায় প্রায় ৫ লাখ ৯৫Routine হাজার মানুষ সরাসরি বন্যার কবলে পড়েছেন। সেখানে পানিবন্দী রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫০০ পরিবার। অন্যদিকে কক্সবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৫৮ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারিভাবে তৎপরতা জোরদার করার দাবি করেছে প্রশাসন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বন্যাকবলিত এই সাতটি জেলার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ১ কোটি ৭৫ লাখ নগদ টাকা এবং ৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন চাল বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া বন্যার পানি আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা মাথায় রেখে দেশের ৬৪টি জেলার জন্য আগাম ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং ৮ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন চাল আপদকালীন রিজার্ভ হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যাতে যেকোনো জরুরি মুহূর্তে দ্রুততম সময়ে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া যায়। জেলা প্রশাসন, স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন এবং সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো মাঠে থেকে সমন্বিতভাবে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। দুর্গত এলাকায় শুকনো খাবার, পানি বিশুদ্ধকরণ বড়ি, চাল ও নগদ অর্থ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।
সাত জেলায় ১০ লাখের বেশি মানুষ বন্যার কবলে পড়া এবং ৫১ জনের অকাল মৃত্যু কোনো সাধারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি একটি জাতীয় সংকট। বিশেষ করে কক্সবাজারে পাহাড়ধসে স্থানীয়দের পাশাপাশি ১৩ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীর মৃত্যু পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ আবাসন ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতাকে নির্দেশ করে। সরকারের ঘোষিত ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বা চালের এই বরাদ্দ ১০ লাখ বুভুক্ষু মানুষের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। প্রত্যন্ত পাহাড়ি ও গ্রামীণ অঞ্চলের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে এখনো শিশু খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট চলছে। আমরা সরকার, সশস্ত্র বাহিনী এবং দেশের সকল বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে বন্যাকবলিত এই সাতটি জেলায় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জোরালো আহ্বান জানাই।