২৪ জুলাই
আন্দোলন এতোটা সহজ ছিলো না। রক্তের স্রোত ও অকথ্য কষ্টের গভীর দিনগুলোর কথা।
২০২৪ সালের জুলাই মাসের দিনগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছে, যা সহজে মুছে যাওয়ার নয়। ওপর থেকে হয়তো আন্দোলনকে কেবল কিছু স্লোগান, রাজপথের জমায়েত বা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের একটি ধাপ হিসেবে দেখা যায়; কিন্তু এর অন্তর্স্থলে রয়েছে বুকফাটা কান্না, স্বজন হারানোর বেদনা এবং অকথ্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের এক রোমহর্ষক ইতিহাস।
অসম লড়াই এবং চরম প্রাণঘাতী দমনপীড়ন
একটি যৌক্তিক ও সাধারণ দাবি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন যখন চতুরতার সাথে রাষ্ট্রযন্ত্র দ্বারা দমন করার চেষ্টা করা হয়, তখন পরিস্থিতি রূপ নেয় চরম রক্তপাতে।
খালি হাতে রাজপথে দাঁড়ানো শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে সাঁজোয়া যান, হেলিকপ্টার থেকে গুলি এবং প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার করা হয়েছিল। এই অসম লড়াইয়ে নিরস্ত্র মানুষের পক্ষে টিকে থাকা এবং বেঁচে থাকা কোনোভাবেই সহজ ছিল না।
গুলিতে নিহতদের তালিকায় কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বা তরুণরাই ছিল না, ছিল বারান্দায় খেলতে থাকা শিশু, রিকশাচালক এবং খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। এই নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ পুরো জাতিকে এক গভীর ট্রমার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল।
যোগাযোগ ব্ল্যাকআউট ও চরম অনিশ্চয়তা সেদিনের ভয়ংকর দিনগুলোর অন্যতম বড় কষ্ট ছিল তথ্য মহাশূন্যতা বা ব্ল্যাকআউট। ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দিয়ে সারা দেশকে একরকম বিচ্ছিন্ন দ্বীপ বানিয়ে ফেলা হয়েছিল।
ঢাকা বা দেশের অন্যান্য প্রান্তের রাজপথে যখন রক্তগঙ্গা বইছে, তখন দূরদূরান্তের মায়েরা জানেন না তাদের সন্তান জীবিত আছে কি না। এই অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ এবং প্রিয়জনের সন্ধানে হাসপাতালের মর্গে মর্গে ঘুরে বেড়ানোর যে মানসিক যন্ত্রণা, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। হাসপাতালের করিডোর ও চিকিৎসকদের অসহায়ত্ব
জুলাইয়ের দিনগুলোতে দেশের হাসপাতালগুলোর চিত্র ছিল নরকের মতো।
ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ অন্যান্য হাসপাতালের জরুরি বিভাগগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। একের পর এক গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত শরীর নিয়ে আসা হচ্ছিল। চিকিৎসকরা হিমশিম খাচ্ছিলেন এত আহত মানুষের জীবন বাঁচাতে। অক্সিজেনের অভাব, রক্তের সংকট এবং স্বজনদের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। চোখের সামনে তরুণ যুবকদের নিথর হয়ে যাওয়ার দৃশ্য চিকিৎসকদের মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল।
এই আন্দোলনের পর দেশের প্রতিটি ঘরে যে ট্রমা তৈরি হয়েছে, তার রেশ আজও কাটেনি।
যেসব মা তাদের সন্তানকে সকালে হাসিমুখে বিদায় দিয়েছিলেন, সন্ধ্যায় তাদের লাশ বুঝে নিতে হয়েছে—তাদের এই শূন্যতা কোনো সান্ত্বনা দিয়ে পূরণ হওয়ার নয়।
যারা পঙ্গুত্ববরণ করেছেন, চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন, তাদের সারা জীবনের এই অক্ষমতা এক নির্মম কষ্টের স্মারক হয়ে বেঁচে আছে।
২৪ জুলাই আন্দোলন কেবল একটি সফলতার গল্প নয়; এটি আত্মত্যাগ, কান্না এবং রক্তের কালিতে লেখা এক মহাকাব্য। এটি এতোটা সহজ ছিল না কারণ এর প্রতিটি পঙক্তি রচিত হয়েছে তাজা প্রাণের বিনিময়ে। ইতিহাসের এই নির্মম অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অধিকার আদায়ের পথ কতোটা কন্টকাকীর্ণ এবং বেদনাদায়ক হতে পারে।
-----
সাজ্জাদুল মিরাজ
সদস্য সচিব
যুবদল, ঢাকা মহানগর উত্তর