
উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেনের ছিটমহল সেউতায় (Ceuta) গত ২৪ ঘণ্টায় ঘটে গেছে নজিরবিহীন অভিবাসন বিপর্যয়। বার্তা সংস্থা এপি, বিবিসি ও রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) থেকে শুক্রবার (৩১ জুলাই) মাত্র এক দিনে স্থল ও জলপথ ব্যবহার করে মরক্কো থেকে প্রায় ৬০ হাজার অভিবাসী সেউতায় প্রবেশ করেছেন। সীমান্ত অতিক্রমের এই বিপজ্জনক চেষ্টায় এ পর্যন্ত অন্তত ৫৭ জন অভিবাসীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিচারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাসকাকে সাথে নিয়ে শুক্রবারই জরুরি সফরে সেউতা পৌঁছান স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ।
অভিবাসীদের একটি বড় অংশ সমুদ্রপথে সাঁতরে পানির ওপর নির্মিত সীমান্ত প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে স্প্যানিশ ভূখণ্ডে ঢোকার চেষ্টা করেন। সরকারের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, নিহতদের মধ্যে অনেকেই সমুদ্রে ডুবে গেছেন এবং অনেকে ব্রেকওয়াটারে ওঠার সময় হুড়োহুড়িতে পদদলিত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।
সেউতার সিভিল গার্ডের প্রতিনিধি রাশিদ সিবিহি এই পরিস্থিতিকে "গুরুতর মানবিক সংকট" উল্লেখ করে বলেন, বহু অভিভাবকহীন শিশুসহ হাজার হাজার মানুষ ফুটপাতে রাত কাটাচ্ছে। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল রূপ নিয়েছে।
বিবিসি জানিয়েছে, এই হঠাৎ অভিবাসী ঢলের পেছনে কাজ করেছে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের সম্প্রতি দেওয়া একটি রায়। আদালতের রায়ে বলা হয়—সেউতা বা স্পেনের অপর ছিটমহল মেলিয়ায় পৌঁছানোর চেষ্টাকালে সমুদ্রে আটক অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে বা জোরপূর্বক মরক্কোতে ফেরত পাঠানো যাবে না।
তবে সংকট সামাল দিতে স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে দ্রুত প্রত্যাবাসন শুরু করেছে। কেবল শুক্রবারেই প্রায় ২৫ হাজার অভিবাসীকে সেউতা থেকে পুনরায় মরক্কোয় ফেরত পাঠানো হয়েছে। সেউতার আঞ্চলিক সরকারপ্রধান হুয়ান হেসুস ভিভাস জাতীয় জরুরি অবস্থা জারির দাবি জানালেও, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা প্রত্যাখ্যান করে অতিরিক্ত পুলিশ ও বল প্রয়োগের মাধ্যমে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সেউতার এই সীমান্ত সংকটের ঢেউ লেগেছে পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নে (EU):
ফ্রান্স: পরিস্থিতি দেখে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ স্প্যানিশ সীমান্তে কঠোর তল্লাশি ও দ্রুত হস্তক্ষেপকারী সীমান্ত বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন।
ইতালি: ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে প্রয়োজনে স্পেনের সাথে 'শেনজেন চুক্তি' (Schengen Area) স্থগিত করে উন্মুক্ত সীমান্ত ব্যবস্থা বন্ধের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের ভূখণ্ড সেউতা দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট। কিন্তু মাত্র একদিনে ৬০ হাজার মানুষের অনুপ্রবেশ এবং ৫৭ জনের মৃত্যু স্পষ্ট করে যে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের অভিবাসন সংকট কতটা রূপ ধারণ করেছে। কেবল সীমান্ত সিল করা বা পুশ-ব্যাক করার নীতি মানবিক বিপর্যয় ঠেকাতে পারছে না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মরক্কোর যৌথ পদক্ষেপে স্থায়ী আন্তর্জাতিক অভিবাসন নীতি তৈরি করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।