
বাংলা চলচ্চিত্রের ক্ষণজন্মা অমলিন তারকা চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহ হত্যা মামলায় প্রায় তিন দশক পর এক চাঞ্চল্যকর মোড় এসেছে। চিত্রনায়ক সালমান শাহকে হত্যার জন্য খলনায়ক আশরাফুল হক ডনের সঙ্গে সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক ও শিল্পপতি আজিজ মোহাম্মদ ভাই ১২ লাখ টাকায় চুক্তি করেছিলেন বলে আদালতে দাবি করেছেন ঢাকার মহানগর পাবলিক প্রসিবিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী।
গতকাল রোববার (৯ আগস্ট) সিআইডি কর্তৃক গ্রেপ্তার হওয়া মামলার অন্যতম প্রধান আসামি চলচ্চিত্র অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে ঢাকার নিম্ন আদালতে হাজির করা হলে শুনানি চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এই বিস্ফোরক তথ্য উপস্থাপন করেন।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি পিপি ওমর ফারুক ফারুকী জানান, অন্য একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় রিজভী আহমেদ নামের এক আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন।
ওই জবানবন্দির বরাত দিয়ে পিপি আদালতে বলেন:
গোপন সম্পর্ক ও শত্রুতা: জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে, সালমান শাহর স্ত্রী সামিরার সঙ্গে শিল্পপতি আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের গোপন সম্পর্ক ছিল।
হত্যার চুক্তি: সেই সম্পর্কের জেরেই সালমান শাহকে পথ থেকে সরিয়ে দিতে আজিজ মোহাম্মদ ভাই অভিনেতা ডনের সঙ্গে ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে চুক্তি করেছিলেন এবং পরবর্তীতে পরিকল্পিতভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়।
শুনানিকালে আদালতে ডনের পক্ষে কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানা আসামি আশরাফুল হক ডনকে জামিন না দিয়ে সরাসরি কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডি পরিদর্শক আরিফুর রহমান ডনকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কারাগারে আটক রাখার আবেদন জানান। সিআইডি আদালতকে জানায়, সালমান শাহ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত ৮ নম্বর আসামি ডন দীর্ঘদিন ধরে আড়ালে ও পলাতক ছিলেন। তাঁকে জামিন দেওয়া হলে মামলার তদন্ত মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে এবং তাঁর পুনরায় আত্মগোপনে যাওয়ার পূর্ণ আশঙ্কা রয়েছে।
উল্লেখ্য, গতকাল রোববার ভোর ৫টার দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে বিদেশ গমনের চেষ্টাকালে ইমিগ্রেশন পুলিশ ডনকে আটক করে এবং পরে সিআইডি (CID)-র কাছে হস্তান্তর করে।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের বাসভবন থেকে চিত্রনায়ক সালমান শাহর রহস্যজনক লাশ উদ্ধার করা হয়। সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই এটিকে ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ বলে দাবি করা হলেও পরবর্তীতে নানা তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনে একে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
তবে পরিবারের নারাজি আবেদন এবং দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে মামলাটি পুনরায় হত্যা মামলা হিসেবে সিআইডির অধীনে তদন্তাধীন রয়েছে। প্রায় ৩০ বছর পর বিমানবন্দরে ডনের গ্রেপ্তার এবং আদালতের এজলাসে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সাথে চুক্তির তথ্য নতুন করে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী নায়ক সালমান শাহর রহস্যজনক মৃত্যু নিয়ে কোটি কোটি ভক্তের মনে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে নানা প্রশ্ন জমে আছে।
এতদিন পর এজাহারভুক্ত আসামি ডনের গ্রেপ্তার এবং আদালতে চাঞ্চল্যকর তথ্যের উদ্ঘাটন মামলাটিকে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির দিকে নিয়ে যাবে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত আসামিদের শাস্তি নিশ্চিত হওয়াই এখন সময়ের দাবি।