
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের খাবার সরবরাহ করার জেরে নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার জাহিদ আল আমিন ওরফে বুলবুল (৪০) নামের এক ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে সন্ত্রাসী বাহিনী। গত ২০ আগস্ট রাতে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মূল পরিকল্পনাকারী শীর্ষ দুষ্কৃতকারী শেখ সিফাতসহ ১১ আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
অভিযানে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সুইচ গিয়ার চাকু, চাপাতি, রামদা, লোহার পাইপ ও ওয়াকিটকিসহ বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
ঘটনা ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, নিহত জাহিদ আল আমিন ওরফে বুলবুল গত ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের খাবার ও সহায়তা প্রদান করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সন্ত্রাসী শেখ সিফাত ও তার সহযোগীরা গত ২৪ জুলাই ২০২৪ রাতে বুলবুলের অটো রিকশার গ্যারেজে অনধিকার প্রবেশ করে প্রায় ১৮ লাখ ১৭ হাজার ৪০০ টাকার অটো রিকশা ও ব্যাটারি চুরি করে নিয়ে যায়।
এ ঘটনায় নিহত বুলবুল বাদী হয়ে বন্দর থানায় মামলা (মামলা নং-১৪, তারিখ: ২০ আগস্ট, ২০২৪) দায়ের করার পর থেকেই সিফাত বাহিনী তাঁকে নিয়মিত প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছিল।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ২০ আগস্ট ২০২৬ তারিখ রাত আনুমানিক ৮:৪০ ঘটিকায় ব্যবসা শেষে বাড়ি ফেরার পথে বন্দর থানাধীন সালেহ নগর এলাকায় তাহের আলী প্রধানের বাড়ির সামনে পাকা রাস্তার ওপর সিফাত ও তার সহযোগীরা বুলবুলের পথরোধ করে। ১ নম্বর আসামি শেখ সিফাতের প্রকাশ্য হুকুমে তারা দেশীয় ধারালো অস্ত্র, চাপাতি, এসএস পাইপ ও চাকু দিয়ে বুলবুলকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর রক্তাক্ত জখম করে। পরবর্তীতে ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় বন্দর থানায় একটি হত্যা মামলা (মামলা নং-৪০, তারিখ: ২১ আগস্ট, ২০২৬, ধারা-৩০২/৩৪ পেনাল কোড) রুজু হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর নারায়ণগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার জনাব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) জনাব তারেক আল মেহেদীর নেতৃত্বে গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স অভিযানে নামে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (খ-সার্কেল) দীপংকর ঘোষের তদারকি ও বন্দর থানার ওসি জনাব মোঃ জামাল উদ্দিনের নেতৃত্বে পরিচালিত বিশেষ টিম ২১ আগস্ট রাত ৩:৩০ ঘটিকায় পাক পাঞ্জাতন সিটির একটি আস্তানা থেকে সিফাতসহ ১১ আসামিকে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তারকৃত প্রধান আসামিবৃন্দ
│ ১. শেখ সিফাত (৩২) (পিতা- শেখ শাহিন) - মূল পরিকল্পনাকারী (১৪টি মামলা)
│ ২. জুম্মন ওরফে হোয়াইট জুম্মন (২৯) (পিতা- আলী আকবর) - (৯টি মামলা)
│ ৩. রিয়াদ (৩৩) (পিতা- সোবাহান) - (৪টি মামলা)
│ ৪. মাহবুব হোসেন ওরফে মাহাফুজ (৩২)
│ ৫. মোঃ সিয়াম (২৫)
│ ৬. ইফরান (২৯)
│ ৭. সিজান ওরফে জিসান (২৬)
│ ৮-১১. মোসাঃ মিনারা (৩৫), নাসিমা (৩৬), রুমা (৩৬) ও ইয়াসমিন (৪০)
অভিযানকালে আসামিদের হেফাজত থেকে উদ্ধার ও জব্দ করা হয়েছে:
ধারালো অস্ত্র: ১টি ছ্যান দা, ১টি স্টিলের চাপাতি, ১টি প্লাস্টিকের বাটযুক্ত ছুরি।
সুইচ গিয়ার ও অন্যান্য: ২টি স্টিলের সুইচ গিয়ার চাকু ও ১টি সাধারণ লোহার পাইপ।
অন্যান্য: ৪টি ভারী এসএস (SS) লোহার পাইপ এবং অপরাধ সংঘটনে ব্যবহৃত ১টি ওয়াকিটকি।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত শেখ সিফাত ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে ছিনতাই, মাদক, চাঁদাবাজি ও একাধিক হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। ধৃত সকল আসামিকে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
ছাত্র আন্দোলনের মতো জাতীয় জাগরণে সাধারণ নাগরিক হিসেবে সহমর্মিতা জানানো এবং পরবর্তীতে সত্যের পক্ষে অবস্থান নিয়ে মামলা করার কারণেই এই আত্মত্যাগ। সন্ত্রাসী সিফাত বাহিনীর এই ন্যক্কারজনক হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যেন ভবিষ্যতে কোনো অপরাধী এভাবে আইনের তোয়াক্কা না করার দুঃসাহস না পায়।