
১৬ বছর পর বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য পরিসংখ্যানে এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। প্রতিবেশী ভারতকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম একক বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে উঠে এসেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।
অন্যদিকে, একই সময়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১০ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার। ফলে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের সুচকে ভারতকে প্রায় ১ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলারে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থান দখল করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বরাবরের মতো তালিকার শীর্ষস্থানটি যথারীতি চীনের দখলেই রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধির পেছনে দেশটিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানির অস্বাভাবিক বৃদ্ধিকে প্রধান অনুঘটক হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।
এনবিআরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়:
আমদানি প্রবৃদ্ধি: এক বছরের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি ৪৩ শতাংশ বেড়ে ২ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার থেকে ৩ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
কৃষিপণ্য ও এলএনজি: আগের বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো গম আমদানি না করা হলেও বিদায়ী অর্থবছরে ২২৭ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলারের গম এনেছে বাংলাদেশ। সয়াবিন বীজের আমদানি ৩৫০ মিলিয়ন থেকে বেড়ে ৬২০ মিলিয়ন ডলার, তুলা আমদানি ২৩০ মিলিয়ন থেকে বেড়ে ৩৮০ মিলিয়ন ডলার এবং সরকারি খাতে এলএনজি আমদানি ৪৮০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
বোয়িং চুক্তি: মার্কিন উড়োজাহাজ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি নতুন এয়ারক্রাফট কেনার সিদ্ধান্তেও সম্মতি দিয়েছে সরকার।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা: গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় আগামী ১৫ বছরে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য এবং ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য কেনার রূপরেখা রয়েছে, যা ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্যিক বন্ধন আরও সুদৃঢ় করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধির ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা গেছে প্রতিবেশী দেশটির ক্ষেত্রে। ভারত থেকে বাংলাদেশের পণ্য আমদানি হ্রাস পেয়েছে প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ভারতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি কমেছে প্রায় ৩ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গত ২০২৫ সাল থেকে দুই দেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের নানামুখী টানাপোড়েন এবং স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধ ও ট্রানজিট সুবিধা বাতিলের মতো পাল্টাপাল্টি বিধিনিষেধের কারণে ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যিক লেনদেনে এই পতন ও স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
বহু বছর পর ভারতের বদলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হয়ে ওঠা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। 'মাটি ও জনতার কথা' মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি ও কৃষিপণ্য আমদানির পাশাপাশি বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্কমুক্ত সুবিধা নিশ্চিত করা এবং একই সাথে প্রতিবেশীদের সাথে বজায় থাকা বাণিজ্য বাধা দূর করাই হবে বাংলাদেশের জন্য বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক কৌশল।