
প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালি সমাজ বিভিন্ন জাতিবর্ণ ও সম্প্রদায়ের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি অসাম্প্রদায়িক সমাজ। ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কারণে কখনো কখনো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হয়েছে বটে; তবে সামাজিক সম্পর্ক ও সামাজিক সহযোগিতার সংস্কৃতি কখনো বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। বাঙালি জাতি এখনো সমাজকে মেনে চলে। সামাজিক সমস্যা বা সংকট নিরসনের জন্য সাধারণত সমাজের দিকেই তাকিয়ে থাকে।
সামাজিক অনুমোদন পেলে একটি কাজ যত সহজে করা যায়, সামাজিক অনুমোদন বা সমর্থন না পেলে সে কাজ তত সহজে করা যায় না। সুতরাং সামাজিক বিধি বা শাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে রাষ্ট্রই সর্বেসর্বা। রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক সেখানে সরাসরি। সমাজ সেখানে গৌণ। তাই সেখানে সামাজিক বিধিগুলো শক্তিশালী নয়। শক্তিশালী হওয়ার প্রয়োজনও পড়ে না। কারণ, রাষ্ট্রই সেখানে নাগরিকের সকল সমস্যার দেখভাল করে থাকে। কিন্তু প্রাচ্যের দেশগুলো সমাজকেন্দ্রিক বলে সমাজ রাষ্ট্রের একটি শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে কাজ করে। সমাজ শক্তিশালী বলেই রাষ্ট্র অনেক সময়ে সামাজিক আইন বা সামাজিক শাসনের অনুমোদন দেয়। আমাদের দেশে সামাজিক শাসনের একটি ঐতিহ্য আছে। সামাজিক শাসন মেনে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা সে ঐতিহ্যেরই অংশ। এখানে নাগরিকগণ অনেক বিষয়ে সরাসরি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কিত নন। এখানে সমাজ নামক প্রতিষ্ঠানটি রাষ্ট্রের মতই শক্তিশালী।
ফলে নাগরিকগণ একদিকে যেমন রাষ্ট্রের নিকট দায়বদ্ধ, তেমনি আবার সমাজের কাছেও দায়বদ্ধ। অর্থাৎ আমাদের দেশের নাগরিকগণ শুধু রাষ্ট্রের আইন মেনে চলেন না; তাদেরকে সামাজিক আইনও মেনে চলতে হয়। এক সময়ে এদেশে সামাজিক আইনের মাধ্যমে সামাজিক শাসনের সংস্কৃতি প্রবলভাবে প্রচলিত ছিল। পরিবার ও সমাজ যৌথভাবে শিশুদের সামাজিকীকরণ ও নীতি-নৈতিকতা শেখানোর দায়িত্ব পালন করতো। যুব সমাজের অবক্ষয় রোধ করার জন্য রাষ্ট্রের আগেই সমাজ এগিয়ে আসতো। বর্তমান সময়ে চুরি, ছিনতাই, খুন, ধর্ষণসহ যে সব বিষয় নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা হয় এবং মামলা নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রিতার কারণে বাদী-বিবাদী নিঃস্ব হয়ে যায়, এক সময়ে সেই সব বিষয় সামাজিক বিচার বা সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হতো। গ্রামের মাতব্বরগণ প্রয়োজন মনে করলে কয়েক গ্রামের মাতব্বর নিয়ে সালিশে বসতেন। এ সালিশের বিচার বা শাসন মেনে নিয়ে সবাই আবার মিলেমিশে বসবাস করতো। এতে সমাজভুক্ত মানুষ মামলার হয়রানি ও মামলা খরচ থেকে রেহাই পেতো। বিচার পেতেও দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হতো না। কিন্তু বর্তমানে সামাজিক ন্যায়বিচারের সে সংস্কৃতি বিলুপ্তির পথে।
অনেক সমাজচিন্তক মনে করেন, সামাজিক ন্যায়বিচার নিরপেক্ষ না হওয়ার ফলে সামাজিক অপরাধের নিষ্পত্তির জন্য আইনের আশ্রয় নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সামাজিক শাসন দুর্বল হওয়ার ফলে আজকাল কেউ কাউকে মেনে চলছে না। সমাজপতিদের মানছে না সমাজের সাধারণ মানুষ। নেতাদের মানছে না কর্মী-সমর্থকরা। পরিবারের সদস্যরাও একে অন্যের শাসন মানছে না। শিক্ষকের উপদেশ থোরাই কেয়ার করছে শিক্ষার্থীরা। অভিজ্ঞ ব্যক্তিগণ ভালো মনে করে কখনো কোনো আদেশ বা উপদেশ দিলে সে সবের তোয়াক্কা করছে না কেউ।
মানুষ এখন নিজেকে নিয়ে এতোটাই ব্যস্ত হয়ে গেছে যে, সমাজভুক্ত থেকেও এক ধরনের বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করছে। আত্মস্বার্থের বিষয়টি খুব বেশি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এখন সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন শুধু মুখে মুখে। আন্তরিকতার অভাব ঘরে বাইরে— সবখানে। সামাজিক ক্ষেত্রে এখন ছোটরা বড়দের শাসন মেনে নেয় না। পারিবারিক ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখতে পাওয়া যায়। এক সময়ে ভাই ভাইয়ের জন্য যেকোনো স্বার্থ ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকতো। এখন ‘আপন থেকে পর ভালো’ নীতিতে চলছে বেশিরভাগ মানুষ। এমন অনেক মানুষ দেখা যায়, যাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সুসম্পর্ক নেই কিন্তু পরিবারের বাইরে অনেক লোকের সঙ্গে সম্পর্ক পারিবারিক সম্পর্কের মতোই নিবিড়।
নাড়ীর টান এখন এতোটাই দুর্বল যে, বৃদ্ধ বাবা-মাকে এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সন্তানের কাছে বোঝা হয়ে যেতে দেখা যায়। এ ব্যাপারে কেউ কাউকে কিছু বলেও না। কারণ, কেউ কারো কথা শোনে না। দিন দিন বড়রা ছোটদের শাসন করার অধিকার হারিয়ে ফেলছে। কেউ নিজের সন্তানকে শাসন করার অধিকার অন্য কাউকে দিচ্ছে না। এই সামাজিক শাসনের অভাবে মানুষ, বিশেষ করে যুবসমাজ স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতি কারো জন্য কাম্য নয়। আমরা সমাজকেন্দ্রিক রাষ্ট্রের নাগরিক। আমরা চাই সমাজ আমাদের সংকট সমাধানে এগিয়ে আসুক।
সমাজ আমাদের ভালো-মন্দের দায়িত্ব নিক। আমার সন্তান তো আমার সমাজেরও সন্তান। তাকে শাসন করার অধিকার সমাজের থাকুক। আর এই অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলেই সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে বেড়ে উঠবে নতুন প্রজন্ম।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সামাজিক শাসনের গুরুত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে সামাজিক ন্যায়বিচারের উপর। ন্যায্যতার ভিত্তিতে সামাজিক বিচার করা হলে সামাজিক শাসনের গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যায়। বর্তমানে সামাজিক শাসনের উপর অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে মূলত ন্যায্যতার অভাব ও সমাজপতিদের পক্ষপাতমূলক আচরণের কারণে। নিজেদের মধ্যে সংঘটিত বিবাদ মেটানোর জন্য উভয় পক্ষ যখন সমাজপতি বা সামাজিক নেতৃত্বের দ্বারস্থ হন তখন সামাজিক আইনের মাধ্যমে তার মীমাংসা করে দেওয়া সমাজপতির পবিত্র দায়িত্ব।
এ দায়িত্ব বিশ্বস্ততার সঙ্গে পালন করা হলেই সামাজিক সালিশ সাধারণ মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্যতা পায়। দুঃখজনক বিষয় হলো, বর্তমান সময়ে সামাজিক সালিশে পক্ষপাতমূলক আচরণের বিস্তর অভিযোগ শোনা যায়। সমাজপতিরা অনেক সময়ে দুর্বলের প্রতি অন্যায় করে থাকেন। বিশেষ সুবিধা পেয়ে সবলের পক্ষে কথা বলেন। নানা কৌশলে প্রভাবশালীদের স্বার্থ রক্ষা করেন। ফলে অনেকক্ষেত্রেই সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না। ন্যায়বিচার না পাওয়ার আশঙ্কা থেকে ভুক্তভোগী অনেকেই আদালতের স্মরণাপন্ন হন।
আদালতে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা মেনে নিয়ে সাধারণ মানুষ বছরের পর বছর মামলা চালাতে থাকেন। মামলা চালাতে গিয়ে বেশিরভাগ মানুষ নিঃস্ব হয়ে যান। অথচ একটি বা দুটি সালিশের মাধ্যমেই অনেক বড় বড় সামাজিক অপরাধের বিচার করা সম্ভব। আর সামাজিক সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হলে সময় ও অর্থ— দুটোই বেঁচে যায়। তবে এক্ষেত্রে জরুরি বিষয় হলো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
এ কথা মানতেই হবে যে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়নি বলেই সামাজিক সালিশের গ্রহণযোগ্যতা ক্রমশ কমে এসেছে এবং এই কমে আসার ফলাফল হয়েছে ভয়াবহ। আমরা যে সামাজিক বন্ধন নিয়ে গর্ববোধ করি সে সামাজিক বন্ধন শিথিল হয়ে গেছে। শুধু সামাজিক বন্ধন নয়; পারিবারিক বন্ধনও এখন ভয়াবহরূপে শিথিল হয়ে গেছে। পরিবারের সদস্যরা এখন পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।