
কুরবানি মূলত হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.)-এর সেই মহান ত্যাগের স্মৃতিবাহী ইবাদত, যা কিয়ামত পর্যন্ত মুমিনদের জন্য এক অনন্য পরীক্ষা।
কিন্তু বর্তমান সময়ে আমরা ইবাদতের এই মূল চেতনা থেকে বিচ্যুত হয়ে বাহ্যিক জৌলুস ও সস্তা জনপ্রিয়তার পেছনে ছুটছি।
পশুর অদ্ভুত ও আপত্তিকর নামকরণ এই বিচ্যুতিকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
ইবাদতের পবিত্রতার বিষয়টি দূরে ঠেলে আমরা মজে আছি সস্তা বিনোদন।
কুরবানি কোনো উৎসব বা কার্নিভাল নয়, এটি একটি শরিয়াহ বিধান। যখন আমরা পশুর নাম ‘ডন’ বা ‘টাইগার’ ট্রাম্প, ডাকাত, মাস্তান, তুফান রাখি,
তখন অজান্তেই আমাদের অবচেতন মন বিষয়টিকে একটি খেলায় রূপান্তর করে ফেলে। মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই নামগুলো নিয়ে যখন ট্রল বা রসিকতা হয়, তখন ইবাদতের সেই গাম্ভীর্য আর অবশিষ্ট থাকে না।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “যে আল্লাহর নিদর্শনাবলিকে সম্মান করে, তা তো তার হৃদয়ের তাকওয়ারই বহিঃপ্রকাশ।” (সূরা হজ: ৩২)।
পশুকে খেলনা বা বিনোদনের পাত্র বানানো এই ‘নিদর্শনাবলির অবমাননা’র শামিল।
পশুর নাম যখন ‘ডাকাত’, ‘মাস্তান’ বা ‘গ্যাংস্টার’ রাখা হয়, তখন একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজে নেতিবাচক বার্তা যায়।
ইসলাম সবসময় সুন্দর ও অর্থবহ নামের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে। পশুর গায়ে এমন নাম সেঁটে দেওয়ার অর্থ হলো, সমাজে যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী, তাদের নামগুলোকে পরিচিতি দেওয়া। একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের রুচিবোধ এমন হওয়া উচিত নয় যে, আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করা পশুর সাথে আমরা কোনো অপরাধী বা জালেমের নাম যুক্ত করব।
এই প্রথা লোকদেখানোর নতুন কৌশল
কুরবানির কবুলিয়াতের একমাত্র শর্ত হলো ইখলাস বা নিষ্ঠা। যখন কোনো পশুকে বিশেষ নাম দিয়ে ব্র্যান্ডিং করা হয়, তখন মূল উদ্দেশ্য আর আল্লাহর সন্তুষ্টি থাকে না;
বরং মুখ্য হয়ে ওঠে ‘সবচেয়ে আলোচিত গরুটির মালিক’ হওয়ার গৌরব।
এই মানসিকতা সরাসরি ‘রিয়া’ বা লোকদেখানো ইবাদত, যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
পশুর নাম ও দাম নিয়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া মানে হলো নিজের আমলনামাকে শূন্য করে দেওয়া।
কুরবানির পশুকে জবাইয়ের আগ পর্যন্ত অত্যন্ত যত্ন ও মায়ার সাথে লালন-পালন করার নির্দেশ রয়েছে। পশুর একটি স্বতন্ত্র মর্যাদা আছে যেহেতু সে আল্লাহর নামে জীবন দিচ্ছে। তাকে ‘ট্রাম্প’ বা ‘বলিউড স্টার’দের নামে ডাকার অর্থ হলো তাকে একটি হাস্যকর বস্তুতে পরিণত করা। এটি পশুর প্রতি এক ধরনের মানসিক নিষ্ঠুরতাও বটে।
তাকে আল্লাহর উপহার হিসেবে গণ্য না করে যখন স্রেফ একটি পণ্য বা প্রদর্শনী হিসেবে দেখা হয়, তখন মুমিনের হৃদয়ে থাকা মায়া ও দয়া লোপ পায়।
এই অপসংস্কৃতি রোধে আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব রয়েছে:
আমরা যেন কখনোই আমাদের পশুকে কোনো বিসদৃশ নাম না দিই এবং কেউ দিলে তাকে নিরুৎসাহিত করি।
সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের উচিত পশুর ওজন বা নাম নিয়ে মুখরোচক খবর প্রচার না করে কুরবানির শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করা।
হাটে গিয়ে ‘বিখ্যাত’ কোনো পশুর সাথে সেলফি তোলা বা ভিড় জমানোর মানসিকতা পরিহার করা।
কুরবানি হলো নিজের অহংবোধ ও পশুত্বকে বিসর্জন দেওয়ার নাম। আমরা যদি পশুর নামকরণের মাধ্যমে সেই অহংকারকেই আবার চাঙ্গা করি, তবে এই ত্যাগের কোনো সার্থকতা থাকে না। আসুন, আমরা লৌকিকতা বর্জন করি এবং বিনম্র চিত্তে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানি পেশ করি। আমাদের পশুর নাম যেন হয় আমাদের অন্তরের তাকওয়ার প্রতিফলন, কোনো সস্তা প্রচারণার হাতিয়ার নয়।