ঢাকা | | বঙ্গাব্দ

ফ্রান্সে তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি, ৪০ মৃত্যু, গাড়ির গরমে ২ শিশুর প্রাণহানি

ফ্রান্সে তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি, ৪০ মৃত্যু, গাড়ির গরমে ২ শিশুর প্রাণহানি ছবি: সংগৃহীত
ad728

তীব্র ও নজিরবিহীন তাপপ্রবাহে (হিটওয়েভ) পুড়ছে গোটা ইউরোপ। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, ইতালি, বেলজিয়াম, স্পেন, জার্মানি, সুইজারল্যান্ডসহ মহাদেশটির বেশিরভাগ দেশই এখন চরম তাপপ্রবাহের কবলে। কোথাও তাপমাত্রা ইতোমধ্যে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে, আবার কোথাও ৪০ ছুঁইছুঁই। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তৈরি হওয়া এই দাবদাহে ইউরোপের স্বাভাবিক জনজীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।


সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ফ্রান্সে। দেশটির অর্ধেকেরও বেশি অঞ্চল তীব্র তাপপ্রবাহে অবরুদ্ধ। প্রচণ্ড গরম থেকে একটু স্বস্তি পেতে ফ্রান্সের সব বয়সী মানুষ দলে দলে নদী, নালা ও খালে নামছেন। আর এতেই ঘটেছে চরম বিপর্যয়।

  • জলাশয়ে প্রাণহানি: গত মঙ্গলবার ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু এক জরুরি বৈঠকের আগে জানান, গত ১৮ জুন থেকে কোনো রকম লাইফগার্ড বা নজরদারিহীন উন্মুক্ত জলাশয়গুলোতে সাঁতার কাটতে গিয়ে সম্প্রতি অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

  • স্কুল-কলেজ বন্ধ: তীব্র গরমের কারণে ফ্রান্সে ৮৪৫টি স্কুল ইতিমধ্যেই পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া প্রায় ১৮০০টি স্কুলে তীব্র গরম এড়াতে শুধুমাত্র সকালের দিকে পাঠদান সচল রাখা হয়েছে। ফ্রান্সের ক্রীড়ামন্ত্রী মারিনা ফেরারি সবাইকে অনিরাপদ বা নিষিদ্ধ জলাশয়ে সাঁতার কাটার বিষয়ে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

৪৩ ডিগ্রি তাপমাত্রা ও দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু

গত সোমবার ফ্রান্সের মধ্য অঞ্চলের পইটিয়ার্সে তাপমাত্রা পূর্বের সব রেকর্ড ভেঙে ৪১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে দাঁড়িয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর সতর্ক করেছে, দেশের পশ্চিমাঞ্চলে তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

এই চরম আবহাওয়ার মধ্যেই দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় বা দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় একটি এলাকায় এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। অতিরিক্ত গরম থেকে বাঁচাতে এক মা তাঁর ২ ও ৪ বছর বয়সী দুই শিশুকে বাড়ির সামনে দাঁড়ানো গাড়ির ভেতর রেখে গিয়েছিলেন। পরে গাড়ি থেকে শিশু দুটিকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয় এবং চিকিৎসকেরা তাদের মৃত ঘোষণা করেন।

এদিকে, গরমের তীব্রতা থেকে নাগরিকদের বাঁচাতে প্যারিস মিউনিসিপ্যালিটি এক অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে—তারা ২৫ বছরের কম এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সিনেমা হলের ফ্রি টিকিট দিচ্ছে।


বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রার চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে উত্তপ্ত হচ্ছে ইউরোপ। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, ‘ওমেগা ব্লক’ নামের একটি বিশেষ উচ্চ বায়ুচাপ আবহাওয়া বিন্যাসের কারণে ইউরোপের বড় অংশজুড়ে একটি বিশাল 'তাপ বলয়' তৈরি হয়েছে, যা দিন দিন তাপমাত্রা বাড়িয়ে তুলছে।

তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে ইউরোপের যোগাযোগ, পরিবহন ব্যবস্থা ও ব্যবসা-বাণিজ্য বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে:

যোগাযোগ বিপর্যয়: অতিরিক্ত গরমে রেললাইনের সুরক্ষায় ট্রেনের গতি কমিয়ে দেওয়ায় প্যারিস থেকে ব্রাসেলসগামী বেশ কিছু ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। প্রচণ্ড গরমে বৈদ্যুতিক পাখার চাহিদা এত বেড়েছে যে প্যারিসের অধিকাংশ দোকানেই ফ্যান ফুরিয়ে গেছে। ফ্রান্সের নিয়োগকর্তাদের সংগঠন ‘মেদেফ’-এর প্রধান প্যাট্রিক মার্টিন জানান, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি অনেকটাই ধীর হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাজ্য ও জার্মানি: যুক্তরাজ্যের রেল কর্তৃপক্ষ ‘নেটওয়ার্ক রেল’ যাত্রীদের শুধুমাত্র জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ট্রেন ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে। লন্ডন ও হিথ্রো বিমানবন্দরে তীব্র ঝড়-বৃষ্টির কারণে বেশ কিছু ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। অন্যদিকে, জার্মানিতে বেশ কয়েক দিন ধরে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রির ওপরে, যা দ্রুতই ৪০ ছুঁতে পারে। জার্মানিতে ইতোমধ্যে হিটস্ট্রোকে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।


ইতালি: তাপপ্রবাহের কারণে ইতালির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেশের ১৫টি শহরে সর্বোচ্চ সতর্কবার্তা বা ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করেছে। কিছু সুনির্দিষ্ট খাতে কাজের সময় কমানো হয়েছে। অতিরিক্ত এসি চলার কারণে বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতি দেখা দেওয়ায় দেশটির তুরিন শহরে জেনারেটর ব্যবহার করা হচ্ছে।
স্পেন: স্পেনের আবহাওয়া সংস্থা দেশের বিভিন্ন অংশে রেড অ্যালার্ট জারি করে তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করেছে। এর আগে দেশটির আন্দুজার এলাকায় তাপমাত্রা রেকর্ড ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়।
বেলজিয়াম: বেলজিয়ামে ক্লাসরুমে অতিরিক্ত গরম সইতে না পেরে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চূড়ান্ত পরীক্ষা পাশের একটি ঠান্ডা গির্জায় (চার্চ) সরিয়ে নেওয়া হয়েছে! যুক্তরাজ্য, বেলজিয়াম এবং পর্তুগালেও নতুন করে তাপপ্রবাহের হাই অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে।

ইউরোপের এই ভয়াবহ দাবদাহ প্রমাণ করে যে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বা ক্লাইমেট চেঞ্জ এখন আর শুধু কোনো তাত্ত্বিক কথা নয়, বরং এক নির্মম বাস্তব। উন্নত বিশ্বের অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের ফল আজ তারা নিজেরাই ভোগ করছে। এসি ও বৈদ্যুতিক পাখার চরম ঘাটতি এবং ঠান্ডা গির্জায় স্কুলের পরীক্ষা নেওয়ার মতো ঘটনাগুলো প্রমাণের দাবি রাখে না যে, প্রকৃতির প্রতিশোধের সামনে আধুনিক বিজ্ঞানও কতটা অসহায়। বিশ্বনেতাদের এখনই পরিবেশ ধ্বংসের মরণখেলা বন্ধ করা উচিত।


আগামী ২৮ মে দেশে পবিত্র ঈদুল আজহা: টানা ৭ দিনের ছুটি

আগামী ২৮ মে দেশে পবিত্র ঈদুল আজহা: টানা ৭ দিনের ছুটি