ঢাকা | | বঙ্গাব্দ

শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যায় স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যুদণ্ড,

শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যায় স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যুদণ্ড, ছবি: সংগৃহীত
ad728
বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর বছরের পর বছর মামলার জটে পিষ্ট বাংলাদেশের  আদালতে হয়ে গেল এক ঐতিহাসিক রায়।
রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিশু শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারকে হত্যা এবং লাশ গুমের চেষ্টার মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার উভয়কেই মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এই ঐতিহাসিক রায়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ে কোনো ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার কাজ সম্পন্ন হওয়ার এক অভূতপূর্ব নজির ও মাইলফলক তৈরি হলো। শিশু রামিসার লাশ উদ্ধারের মাত্র ২০ দিনের মাথায় এই বহুল আলোচিত মামলার রায় ঘোষিত হলো।

আজ রোববার (৭ জুন) দুপুর পৌনে ১২টার দিকে জনাকীর্ণ আদালতে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রধান আসামি সোহেল রানাকে কাঁদতে দেখা যায় এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার নির্বাক চোখে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছিলেন। রায়ের পর পরই তাদের সাজা পরোয়ানা দিয়ে কঠোর পুলিশি পাহারায় কারাগারে পাঠানো হয়।


ট্রাইব্যুনালের রায়ে কেবল দুই আসামির মৃত্যুদণ্ডই দেওয়া হয়নি, বরং তাদের কঠোর আর্থিক দণ্ডেও দণ্ডিত করা হয়েছে:
প্রধান আসামি সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

রায়ে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, দণ্ডিত এই স্বামী-স্ত্রীর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে জরিমানার অর্থ আদায় করত তা ভুক্তভোগী (রামিসার) পরিবারকে হস্তান্তর করতে হবে।

মাত্র ৫ কার্যদিবসে বিচার! 
ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রতার চেনা রূপ ভেঙে এই মামলাটি দেশের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে:
১৯ মে, ২০২৫: পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের একটি অ্যাপার্টমেন্টের সাবলেট বাসা থেকে রামিসার বীভৎস লাশ উদ্ধার হয়।

২৪ মে, ২০২৫: ঘটনার মাত্র ৫ দিনের মাথায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান আদালতে চার্জশিট বা অভিযোগপত্র জমা দেন।

১ জুন, ২০২৬: ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। (বিচার কাজ দ্রুত চালাতে বিচারকদের ১৫ জুন পর্যন্ত নির্ধারিত অবকাশকালীন ছুটি প্রধান বিচারপতির বিশেষ আদেশে বাতিল করা হয়েছিল)।

২ জুন, ২০২৬: মাত্র একদিনের মধ্যে নিহত শিশুর বাবা-মা ও প্রতিবেশীদের সহ মোট ১৬ জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন করা হয়।

৩ ও ৪ জুন, ২০২৬: আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন ও উভয় পক্ষের চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক শুনানি শেষ হয়।

৭ জুন, ২০২৬ (আজ): ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক চূড়ান্ত রায় ঘোষণা।

এর আগে গত বছর মাগুরায় আলোচিত ‘আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার’ বিচার ১৪ কার্যদিবসে সম্পন্ন হয়েছিল, যা ছিল এতদিনের রেকর্ড। রামিসা হত্যা মামলা সেই রেকর্ড ভেঙে মাত্র ৫ কার্যদিবসে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করল।


আসামিদের সর্বোচ্চ সাজার এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিহতের পরিবার, রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ।
রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন:
“আলহামদুলিল্লাহ, রায়ে শতভাগ খুশি। এই রায়ে আমার মনের যে প্রত্যাশা, যে আকাঙ্ক্ষা—সেটা আমি পেয়েছি। আল্লাহ পাকের রহমত ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী (তরেক রহমান)-এর দেওয়া সময়ের মধ্যে আমরা কাঙ্ক্ষিত রায় পেয়েছি। বিচারক, পুলিশ, সাংবাদিক ও দেশের আপামর জনতা যারা আমাদের বিপদে পাশে ছিলেন, সবার কাছে কৃতজ্ঞতা। এখন আমি আমার মেয়ের হত্যাকারীদের ফাঁসি দ্রুত কার্যকর দেখতে চাই।”

রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু এবং রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুসা কালিমূল্যাহ উভয়েই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। মুসা কালিমূল্যাহ বলেন, “অপরাধী তার অপরাধের উপযুক্ত বিচার পেয়েছে। আমি রায়ে সন্তুষ্ট।” সাজার বিরুদ্ধে আপিল করার প্রশ্নে তিনি জানান, রাষ্ট্রপক্ষ নির্দেশ দিলে তিনি পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন।


রায়ের পর সুপ্রিম কোর্টের প্রাঙ্গণে এক ব্রিফিংয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল এই রায়কে বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়ার এক অবিস্মরণীয় ‘মাইলফলক’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
এদিকে সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, উচ্চ আদালতে ফাস্ট ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে আগামী ৩ মাসের মধ্যে এই রায় কার্যকর করা সম্ভব। তিনি আইনি প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে বলেন:
আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে নিম্ন আদালতের ফাইল সুপ্রিম কোর্টে আসবে এবং পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে এর পেপারবুক প্রস্তুত করা হবে।

সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ যদি বিশেষ বিবেচনায় অগ্রাধিকার (Priority) দিয়ে দুই সপ্তাহের মধ্যে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি শেষ করেন, তবে সর্বোচ্চ ৩ মাসের মধ্যে পুরো আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ফাঁসি কার্যকর করা সম্ভব হবে।

"এটি আমাদের সমাজের বিবেকের পরীক্ষা"
রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক মাসরুর সালেকীন অত্যন্ত কঠোর ও আবেগঘন কিছু বার্তা দিয়েছেন। তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন:

“শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের এই মামলাটি কেবল একটি সাধারণ ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রম নয়। এটি আমাদের সমাজের বিবেক, মানবতা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের প্রতি এক গভীর ও কঠিন পরীক্ষা। শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। যখন কোনো শিশু এমন জঘন্য অপরাধের শিকার হয়, তখন তা শুধু একটি পরিবারকে নয়, সমগ্র সমাজকে গভীরভাবে আহত করে।”

বিচারক আরও আশা প্রকাশ করেন যে, রামিসা হত্যা মামলার মতো দ্রুত, দক্ষ ও মানসম্মত তদন্ত এবং বিচারিক কার্যক্রম ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য সকল শিশু নির্যাতন ও সহিংসতা সংক্রান্ত ট্রাইব্যুনালে (যেখানে বর্তমানে ১,৮০০-এর বেশি মামলা ঝুলন্ত রয়েছে) একটি অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত বা মডেল হিসেবে বিবেচিত হবে।


বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর বছরের পর বছর মামলার জটে পিষ্ট বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় এই রায় এক নতুন আশার আলো। মাত্র ২০ দিনে মায়ের কোল খালি করা নরপশুদের ফাঁসির দড়ির মুখোমুখি করা প্রমাণ করে—রাষ্ট্র ও প্রশাসন যদি সদিচ্ছা দেখায়, তবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেও ন্যায়বিচার নিশ্চিতের পথ তৈরি হয়। ‘মাটি ও জনতার কথা’ পরিবার আশা করে, উচ্চ আদালতেও আইনমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আগামী ৩ মাসের মধ্যে ফাঁসির রায় কার্যকর হবে এবং শিশু রামিসার আত্মা শান্তি পাবে।

ফ্রিজে কোরবানির মাংস সংরক্ষণের সঠিক পদ্ধতি: পুষ্টিগুণ ও স্বা

ফ্রিজে কোরবানির মাংস সংরক্ষণের সঠিক পদ্ধতি: পুষ্টিগুণ ও স্বা