ঢাকা | | বঙ্গাব্দ

‘ইসলামী ব্যাংকের এমডি নিয়োগে সরকারের হস্তক্ষেপ হয়নি, আমানতকারীরা আতঙ্কিত হবেন না’:

‘ইসলামী ব্যাংকের এমডি নিয়োগে সরকারের হস্তক্ষেপ হয়নি, আমানতকারীরা আতঙ্কিত হবেন না’: ছবি: সংগৃহীত
ad728

ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারের কোনো ধরনের অবৈধ হস্তক্ষেপের অভিযোগ সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংককে সব ধরনের লিকুইডিটি বা তারল্য সাপোর্ট দিতে চায় এবং ব্যাংকটিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

আজ শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে গভর্নর এসব কথা বলেন।


ব্যাংক খাতের এক-তৃতীয়াংশ ডিপোজিট চুরি হয়ে গেছে!

দেশের ব্যাংক খাতের চলমান নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান মন্তব্য করেন, দেশের ব্যাংক খাতের একটি বড় অংশ বর্তমানে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন:

“বিগত সময়ে কিছু ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে বা অন্য উপায়ে বেরিয়ে গেছে। ব্যাংক খাতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ডিপোজিট (আমানত) চুরি হয়ে গেছে। এমন একটি অস্থিতিশীল ব্যাংকিং সিস্টেমকে পুনরায় স্থিতিশীল ও পুনর্গঠন করতে হলে সবাইকে কিছুটা ধৈর্য ধরতে হবে।” গভর্নর আরও জানান, ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি দুর্বল ব্যাংককে আর্থিক স্থিতিশীলতায় ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিরলস কাজ করছে। এর ইতিবাচক ফলও মিলতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিন ধরে যেসব আমানতকারী ব্যাংক থেকে নিজেদের টাকা ফেরত পাচ্ছিলেন না, তাঁরা এখন ধীরে ধীরে টাকা পেতে শুরু করেছেন।


যেভাবে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হলো ইসলামী ব্যাংকের এমডি নিয়োগ

ইসলামী ব্যাংকের এমডি নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা তুলে ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর জানান, গত ২৫ মার্চ আবেদন গ্রহণের শেষ তারিখ ছিল। এরপর নিয়ম অনুযায়ী বিভিন্ন সংস্থার গোপন প্রতিবেদন (রিপোর্ট) সংগ্রহ, পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই এবং দীর্ঘ সাক্ষাৎকার গ্রহণ শেষে মে মাসে নতুন এমডি নির্বাচন করা হয়। পরবর্তীতে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সার্চ কমিটি এবং খোদ প্রধানমন্ত্রীর চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পরই পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া আইনসম্মতভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এখানে কোনো মহলের বা সরকারের অন্যায্য হস্তক্ষেপের সুযোগ ছিল না।

তিনি আরও জানান, একই সময়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড গঠনেও কিছুটা সময় লেগেছে। তবে নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর সম্প্রতি ব্যাংকের প্রথম সফল বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।


৫ ইসলামী ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার সমন্বয় বড় চ্যালেঞ্জ

গভর্নর বলেন, এই মুহূর্তে দেশের পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার (CBS) সমন্বয়ের কাজ চলছে, যা আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি ও সংশ্লিষ্ট বিভাগ দিনরাত এ নিয়ে কাজ করছে। আশা করা যাচ্ছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই সমন্বয় কার্যক্রমে বড় ধরনের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে।

হস্তক্ষেপের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “আমরা কাউকে বিশেষ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিতে বলি না। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলি বা পদোন্নতির জন্যও বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো নির্দেশ দেয় না। ফলে হস্তক্ষেপের এই অভিযোগগুলোর কোনো ভিত্তি নেই।”

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত পাঁচ সদস্যের বোর্ডের একজন সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় গত ১৬ মার্চ তাঁকে বোর্ড থেকে অপসারণ করা হয়। এর বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর কোনো হস্তক্ষেপ ছিল না।


অস্বাভাবিক এডি রেশিও এবং ঈদের আগে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা

গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পবিত্র ঈদুল আজহার ঠিক আগে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদত্যাগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি মহল বাজারে কৃত্রিম অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা চালিয়েছিল। যেহেতু এটি একটি ‘সিস্টেমিক ব্যাংক’ (অর্থনীতিতে বড় প্রভাব বিস্তারকারী ব্যাংক), তাই বোর্ডে ন্যূনতম সদস্যসংখ্যা নিশ্চিত করতে এবং গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দ্রুত নতুন চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ দিতে হয়েছে।

ঋণ ও আমানতের অনুপাত (AD Ratio) নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে গভর্নর জানান:

  • জুলাই ২০২৪: ইসলামী ব্যাংকের এডি রেশিও ছিল প্রায় ৯৩ শতাংশ।

  • মার্চ ২০২৬: এটি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ৯৭-৯৮ শতাংশে পৌঁছায়।

বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে এই এডি রেশিও দ্রুত কমিয়ে এনে নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছে।


আমানতকারীদের জন্য গভর্নরের জরুরি বার্তা: ‘আতঙ্কের কিছু নেই’

সংবাদ সম্মেলনের শেষভাগে আমানতকারীদের আশ্বস্ত করে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো যথেষ্ট টুলস ও আইনি ক্ষমতা আছে। প্রয়োজন হলে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে সেগুলো প্রয়োগ করা হবে। আমানতকারীদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তাঁরা চাওয়া মাত্র যেকোনো সময় ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে পারবেন। প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংক যেকোনো জরুরি লিকুইডিটি (তারল্য) সাপোর্ট দেবে। ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সামনে বড় কোনো সমস্যা হবে বলে আমি মনে করি না।”

দেশের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের তারল্য সংকট ও এমডি নিয়োগ নিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে যে ধোঁয়াশা ছিল, বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে গভর্নরের এই বক্তব্য তা অনেকটাই দূর করবে। এক-তৃতীয়াংশ ডিপোজিট চুরির তথ্যটি যেমন চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক, ঠিক তেমনি গ্রাহকদের টাকা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘ইমার্জেন্সি লিকুইডিটি সাপোর্ট’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি সাধারণ আমানতকারীদের মনে স্বস্তি ফেরাবে।