ঢাকা | | বঙ্গাব্দ

৭-১ আবারও জার্মানি প্রতিপক্ষ শুধু ব্রাজিলের বদলে কুরাসাও

৭-১ আবারও জার্মানি প্রতিপক্ষ শুধু ব্রাজিলের বদলে কুরাসাও ছবি: সংগৃহীত
ad728
বিশ্বকাপের মঞ্চে নতুন দল কুরাসাও। নতুন উদ্দিপনা ও উত্তেজেনায় মাঠে নেমেছে তারা। অনেকেই দেশটির নাম এই প্রথম শুনলেন। দক্ষিণ ক্যারিবিয়ান সাগর এবং ডাচ ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের একটি কম এন্টিলিস দ্বীপ দেশ, প্রায় ভেনিজুয়েলা উপকূলের ৬৫ কিমি উত্তরে।নেদারল্যান্ডস রাজ্যের একটি সাং বিধানিক দেশ । এই কুরাসাও দেশটির সাথে ইতিহাসের মহাপরাক্রমশালী দেশ ব্রাজিলের এক তিক্ত অভিজ্ঞতার ঘটনা পুনরায় মনে করিয়ে দিল । 
বিশ্বকাপের মঞ্চে ‘৭-১’ স্কোরলাইনটির নাম শুনলেই এখনো দুমড়ে-মুচড়ে যায় ব্রাজিলিয়ান ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়। সেই ভয়ার্ত স্মৃতির ক্ষত যেন আজও টাটকা।  


হিউস্টন স্টেডিয়ামে কুরাসাওয়ের বিপক্ষে জার্মানি যেন টাইম মেশিন চালিয়ে ফিরে গেল সেই সোনালী দিনে। অভিষেক ম্যাচে কুরাসাওকে ঠিক সেই ৭-১ ব্যবধানেই বিধ্বস্ত করে জার্মানি মনে করিয়ে দিল—বিশ্বমঞ্চে গোলবন্যার ধারায় তারা এখনো কতটা ভয়ংকর। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতিটিকেও যেন হিউস্টনের আকাশে নতুন করে লিখে দিয়ে গেল।

চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে ছোটো দেশটির ফল কেমন হতে পারে—সেটা সহজেই অনুমেয় ছিল। প্রত্যাশিতভাবেই গোলউৎসব করে বড় জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছে জার্মানি। আর ইতিহাস গড়ে তাদের জালে একবার বল পাঠানোই এই ম্যাচের একমাত্র প্রাপ্তি হয়ে থাকল কুরাসাওয়ের। 



হিউস্টন স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ‘ই’ গ্রুপের ম্যাচে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে আসা কুরাসাওকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে জার্মানি। ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে ৭৩ ধাপ এগিয়ে থাকা দলের বিপক্ষে প্রথামার্ধে ফেলিক্স এনমেচা, নিকো শ্লটারবেক, কাই হাভার্টজ। এরপর দ্বিতীয়ার্ধে ব্যবধান বাড়ান জামাল মুসিয়ালা, নাথানিয়াল ব্রাউন, দেনিজ উন্দাভ ও হাভার্টজের জোড়ায়। আর কুরাসাওয়ের হয়ে ঐতিহাসিক গোলটি আসে লিভানো কোমেনেনসিয়ার নৈপুণ্যে।

ম্যাচের সব পরিসংখ্যানই বার্তা দিচ্ছে দুই দলের ফারাক। ৬৫ শতাংশ বল দখলে রেখে ২৬টি শট নিয়ে ১২টি লক্ষ্যে রেখেছে জুলিয়ান নাগেলসম্যানের জার্মানি। যেখানে ৮টি শট নিয়ে দুটি লক্ষ্যে রাখে কুরাসাও।

ম্যাচের শুরু থেকেই আগ্রাসী ফুটবলে জার্মানি বুঝিয়ে দিয়েছিল, বড় জয়েই চোখ তাদের। ষষ্ঠ মিনিটেই তার সুফল পায় চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ফ্লোরিয়ান ভির্টজের বাড়ানো বল থেকে দুর্দান্ত এক শটে জালের দেখা পান ফেলিক্স এনমেচা। এর আগে মুসিয়ালা শট নিলেও কুরাসাও গোলকিপারের কল্যাণে বেঁচে যায় বিশ্বকাপের সবচেয়ে ছোটো দলটি, কিন্তু এনমেচার নিখুঁত ফিনিশিংয়ে আর রক্ষা হয়নি। এই গোলের মাধ্যমে একটি ব্যক্তিগত রেকর্ডও গড়েছেন এনমেচা; বিশ্বকাপের অভিষেকে গোল করার তালিকায় নিজেকে নাম লেখালেন তিনি। 

গোলের পর যেন আক্রমণের ধার আরও বাড়িয়ে দেয় জার্মানরা। জার্মানির শক্তিশালী আক্রমণের ঢেউ সামলাতে কুরাসাও তখন রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। তবে দেড় লাখ মানুষের এই ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি লড়াই জমানোর চেষ্টা করে সফল হয় ২১ মিনিটে। রূপকথার গল্পের শুরুটা যেন তখনই হলো! চমৎকার এক আক্রমণ থেকে বল পেয়ে যান লিভানো কোমেনেনসিয়া। তার বাঁ-পায়ের জোরালো শট জশুয়া কিমিচের গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে পরাস্ত করল ম্যানুয়েল নয়্যারকে। বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম গোলটি পাওয়ার আনন্দ—যে মুহূর্ত হিউস্টনের গ্যালারিতে ‘নীল ঢেউ’য়ের গর্জন তুলে দিয়েছিল। 

গোল হজমের পর কিছুটা ছন্দ হারিয়েছিল জার্মানি। তবে ৩৮ মিনিটে আবারও নিজেদের শক্তিমত্তা ফিরে পায় তারা। ব্রাউনের নেওয়া কর্নার থেকে আনমার্কড অবস্থায় থাকা শ্লটারবেকের হেড সরাসরি জড়ায় জালে। আবারও লিড নেয় জার্মানি।

প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে ব্যবধান বাড়ায় জার্মানরা। ডি-বক্সের ভেতর এনমেচাকে ফাউল করলে রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজান। স্পট কিক থেকে নিখুঁতভাবে গোল করে জার্মানিকে ৩-১ গোলের স্বস্তিদায়ক লিড এনে দেন কাই হাভার্টজ। বিরতির পর সেই চেনা জার্মানিকেই দেখা গেল। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই মুসিয়ালা ব্যবধান বাড়ান, এরপর একে একে লক্ষ্যভেদ করেন ব্রাউন ও উনদাভ। ম্যাচের শেষ দিকে হাভার্টজের দারুণ এক চিপে পূর্ণ হয় গোল উৎসব।ম্যাচ তখন পুরোপুরি জার্মানির নিয়ন্ত্রণে। ৪৭ মিনিটে কিমিচের বাড়ানো নিখুঁত পাসটি ডি-বক্সের ডান দিক থেকে দারুণ দক্ষতায় কুরাসাও গোলকিপার রুমকে পরাস্ত করে বাঁ-দিকের কোণ দিয়ে জালে জড়িয়ে দিলেন মুসিয়ালা।



জার্মান আক্রমণের ঝড়ে দিশেহারা কুরাসাও রক্ষণভাগ। তাদের দম ফেলার সুযোগ না দিয়ে ৬৮ মিনিটে উনদাভের জাদুকরী এক ফ্লিক থেকে বল চলে আসে ব্রাউনের পায়ে, আর তা থেকে জোরালো শটে লক্ষ্যভেদ করেন এই ফুলব্যাক। ভিএআর পরীক্ষা শেষে গোলটি বৈধ ঘোষণা করা হয়। আর এই গোলের মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের গোলের খাতা খুললেন ব্রাউন।

জার্মান আক্রমণের সামনে কুরাসাওয়ের অসহায় রক্ষণভাগের সুযোগ কাজে লাগান উন্দাভ। ৭৮ মিনিটে হাভার্টজের পাস থেকে জশুয়া কিমিচ চাইলে নিজেই শট নিতে পারতেন, কিন্তু নিঃস্বার্থভাবে বল বাড়িয়ে দিলেন তিনি উন্দাভকে। উন্দাভের নেওয়া শটটি লিয়ান্দ্রো বাকুনার গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে জড়িয়ে যায় জালে।এরপরই হিউস্টনের মাঠে ফেরে ব্রাজিলের সেই দুঃসহ স্মৃতি। ৮৮ মিনিটে উনদাভের দারুণ এক থ্রু-বল থেকে বল নিয়ন্ত্রণে নেন কাই হাভার্টজ। এরপর কুরাসাও গোলরক্ষক রুমের মাথার ওপর দিয়ে বল চিপ করে অত্যন্ত শৈল্পিক ভঙ্গিমায় জালে জড়িয়ে দেন এই আর্সেনাল স্ট্রাইকার। ম্যাচে আর্সেনাল ফরোয়ার্ডের জোড়া গোল নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের ঘাও ফিরিয়ে আনা নিশ্চিত করল নাগেলম্যানের দল।
‘ই’ গ্রুপে জার্মানির পরের ম্যাচ আইভরি কোস্টের বিপক্ষে। আগামী ২০ জুন বাংলাদেশ সময় রাত দুইটায় গ্রুপপর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে মাঠে নামবে তারা। এরপর ইকুয়েডরের বিপক্ষে মাঠে নামবে কুরাসাও। সেই ম্যাচে কী ঘটে সেটা দেখার অপেক্ষায় আমরা।