ঢাকা | | বঙ্গাব্দ

সড়কে অটোরিকশা: অপমৃত্যু, বিদ্যুৎ অপচয় ও মাদকের অভয়ারণ্য

সড়কে অটোরিকশা: অপমৃত্যু, বিদ্যুৎ অপচয় ও মাদকের অভয়ারণ্য ছবি: সংগৃহীত
ad728

রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের গ্রাম-গঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চল—আজ সর্বত্রই এক মারাত্মক আতঙ্কের নাম ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। শৃঙ্খলাহীন গতি, বেপরোয়া চালনশৈলী এবং কোনো প্রকার নীতিমালার তোয়াক্কা না করে রাজপথ চষে বেড়ানো এই থ্রি-হুইলারগুলো যেন দেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য এক ‘ক্যান্সার’ বা মারাত্মক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও এই অবৈধ বাহনের কারণে ঝরছে তাজা প্রাণ, পঙ্গুত্ব বরণ করছেন অসংখ্য মানুষ। কেবল সড়ক দুর্ঘটনাই নয়; দেশের বিদ্যুৎ সংকট তীব্র করা এবং অপরাধের নেটওয়ার্ক বিস্তারেও এই বাহনটির ভূমিকা এখন উদ্বেগের চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।





দুর্ঘটনা ও অপমৃত্যু: পরিসংখ্যানে ভীতিকর চিত্র

বিভিন্ন সড়ক নিরাপত্তা সংগঠনের তথ্য ও গবেষণা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সারাদেশে প্রতিদিন গড়ে যতগুলো সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে, তার মধ্যে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশেরও বেশি দুর্ঘটনার পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী এই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা।

অনিয়ন্ত্রিত এই বাহনটির মূল বিপজ্জনক দিকগুলো হলো:

  • কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স বা প্রশিক্ষণ নেই: শতকরা ৯৯ ভাগ চালকেরই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ কিংবা ট্রাফিক সিগন্যাল সংক্রান্ত ন্যূনতম জ্ঞান নেই।

  • ফিটনেস ও ব্রেক ব্যবস্থার ত্রুটি: স্থানীয় ওয়ার্কশপে হালকা কাঠামোয় তৈরি এসব রিকশায় উচ্চগতির মোটর বসানো হলেও এর ব্রেকিং সিস্টেম অত্যন্ত দুর্বল। গতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে প্রতিনিয়ত উল্টে যাওয়া বা বড় যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।

  • মহাসড়কে অনধিকার প্রবেশ: আইনি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ট্রাফিক পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অবাধে দূরপাল্লার মহাসড়ক ও ব্যস্ততম ভিআইপি সড়কে উঠে পড়ে এরা, যা বড় ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার মূল কারণ।

        

সড়কে অটোরিকশার বহুমুখী সংকটের চিত্র
┌─────────────────────────────────────────────────────────┐ │ ১. দুর্ঘটনা (সড়ক দুর্ঘটনার ৩০-৩৫% কারণ) │ ২. বিদ্যুৎ অপচয় (দৈনিক কোটি কোটি ইউনিট অবৈধ চার্জ) │ │ ৩. সামাজিক অপরাধ (মাদক পরিবহন ও সেবন) │ │ ৪. যানজট (যত্রতত্র পার্কিং ও উল্টো পথে চলাচল) └─────────────────────────────────────────────────────────┘


জাতীয় বিদ্যুৎ সংকট ও অবৈধ চার্জিং সিণ্ডিকেট

দেশ যখন বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানামুখী কারণে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা করছে এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে নানা পদক্ষে নেওয়া হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে দেশের প্রায় ৪০ লাখেরও বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা গিলে খাচ্ছে প্রতিদিন হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।

অভিযোগ রয়েছে, দেশের অলিগলিতে গড়ে ওঠা অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট ও গ্যারেজগুলোতে চোরাই ও অবৈধ বিদ্যুতের লাইন ব্যবহার করে রাতভর এসব রিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হয়। এর ফলে সরকার শত শত কোটি টাকার রাজস্ব থেকে যেমন বঞ্চিত হচ্ছে, তেমনি সাধারণ বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানায় সৃষ্টি হচ্ছে মারাত্মক বিদ্যুৎ বিভ্রাট।



মাদকের বিপণন, অপরাধের মাধ্যম ও মাতাল চালক

অটোরিকশাকে ঘিরে কেবল সড়কেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে না, এটি এখন রূপ নিয়েছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের এক নিরাপদ মাধ্যমে। দেশের বিভিন্ন থানা ও গোয়েন্দা পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য:

  • মাদক সরবরাহ: অটোরিকশার ভেতরের গোপন প্রকোষ্ঠ ও সিটের নিচে ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজাসহ নানা ধরনের মাদকদ্রব্য এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় পৌঁছে দিচ্ছে একশ্রেণির অসাধু চালক। ছোট বাহন হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে যাওয়া তাদের জন্য সহজ হয়।

  • মাদকসেবী চালক: চালকদের একটি বড় অংশ নিজেরাও চরমভাবে মাদকাসক্ত। নেশাগ্রস্ত ও মাতাল অবস্থায় তীব্র গতিতে গাড়ি চালিয়ে তারা নিজেদের পাশাপাশি পথচারী ও যাত্রীদের জীবন চরম ঝুঁকিতে ঠেলে দিচ্ছে।

  • ছিনতাই ও অপরাধের রুট: গভীর রাতে ও নির্জন অলিগলিতে ছিনতাইকারী চক্র এই বাহনটি ব্যবহার করে দ্রুত চম্পট দেয়।






নই সিদ্ধান্ত না নিলে অপূরণীয় ক্ষতির আশঙ্কা

সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ নাগরিকদের মতে, অটোরিকশার এই তণ্ডবলীলা এখনই শক্ত হাতে দমন করা না গেলে দেশের সড়ক খাত সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়বে এবং ক্ষতির পরিমাণ আর কোনোভাবেই পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।

বিশেষজ্ঞদের সুপারিশমালা: ১. অবৈধ গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্ট উচ্ছেদ: অবৈধ বিদ্যুতের চোরাই লাইন বিচ্ছিন্ন করে চার্জিং গ্যারেজগুলো গুঁড়িয়ে দিতে হবে।

২. মহাসড়কে শতভাগ নিষেধাজ্ঞা: প্রধান সড়ক ও জাতীয় মহাসড়কে অটোরিকশা ওঠার সাথে সাথে বাজেয়াপ্ত করার কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।

৩. বিকল্প কর্মসংস্থান ও নীতিমালা: চালকদের একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর আওতায় এনে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে এবং অনুমোদনহীন থ্রি-হুইলারের স্থানীয় উৎপাদন বা সংযোজন কারখানাগুলো বন্ধ করতে হবে।


জীবিকার দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর ধরে লাখ লাখ মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলার এই অনিয়ম আর চলতে পারে না। শৃঙ্খলাহীন অটোরিকশার সংস্কৃতি থেকে দেশকে বের করে আনতে ট্রাফিক পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়কে সমন্বিত কঠোর অভিযানে নামাই এখন সময়ের দাবি।


সর্বশেষ সংবাদ
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্ব: সৌদি যুবরাজকে শি জিনপিংয়ের ফোন

আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্ব: সৌদি যুবরাজকে শি জিনপিংয়ের ফোন