রাজধানী মিরপুরের পল্লবীতে শিশু রামিসা হত্যার বিচারের দাবিতে দেশজুড়ে তীব্র বিক্ষোভ ও ক্ষোভের মাঝেই এবার চট্টগ্রাম মহানগরের বাকলিয়ায় ৩ বছরের এক অবুঝ শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনাস্থলে ক্ষুব্ধ জনতার সাথে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করেছে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) দুপুরে বাকলিয়ার চেয়ারম্যানঘাটা এলাকার আবু জাফর রোডের ‘বিসমিল্লাহ ম্যানশন’ ভবনে এই পৈশাচিক ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, ভুক্তভোগী শিশুটির মা একটি পোশাক কারখানায় (গার্মেন্টস) চাকরি করেন এবং বাবা পেশায় একজন রিকশাচালক। আজ দুপুরে শিশুটিকে বাসার একটি কক্ষে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে তার মা-বাবা দুজনেই জীবিকার তাগিদে বাইরে যান। বাসায় ছোট্ট শিশুটিকে একা পেয়ে পাশের একটি দোকানের কর্মচারী (৩২) কৌশলে ঘরে ঢুকে তাকে ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ ওঠে।
দুপুরের দিকে ঘটনাটি জানাজানি হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। উত্তেজিত জনতা তাৎক্ষণিকভাবে অভিযুক্ত যুবককে হাতেনাতে ধরে ফেলে এবং নিকটবর্তী একটি মাদ্রাসার গেটে নিয়ে তালাবদ্ধ করে অবরুদ্ধ করে রাখে।
খবর পেয়ে বাকলিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষুব্ধ জনতা কোনোভাবেই পুলিশকে বিশ্বাস করতে রাজি হয়নি এবং আইন নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার দাবি জানিয়ে অভিযুক্তকে তাদের হাতে সোপর্দ করার জন্য পুলিশের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতে থাকে।
রণক্ষেত্র বাকলিয়া: পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি ব্যাক করতে বাধ্য
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুলিশ যখন অবরুদ্ধ অভিযুক্তকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তখন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে বাধা দেয়। শুরু হয় দুপক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও হাতাহাতি। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে থানা থেকে কয়েক দফায় অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স পাঠানো হলেও উত্তেজিত জনতার প্রতিরোধের মুখে পুলিশের অন্তত ৩ থেকে ৪টি গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছেও পিছু হটতে বাধ্য হয়। প্রায় এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে পুরো আবু জাফর রোড এলাকাটি সম্পূর্ণ জনতার নিয়ন্ত্রণে ছিল।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অ্যাকশন: একপর্যায়ে পুলিশ অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে বের হতে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শটগানের গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেটসহ ব্যাপক টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। এতে পুলিশের লাঠিচার্জ ও গুলিতে বেশ কয়েকজন স্থানীয় আন্দোলনকারী আহত হয়েছেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে আহতদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানা যায়নি।
ওসিসিতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় শিশু:
এদিকে ঘটনার পরপরই রক্তাক্ত ও গুরুতর অবস্থায় ৩ বছর বয়সী ওই শিশুটিকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে শিশুটির শারীরিক অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি, অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন:
উদ্বেগজনক এই ঘটনার পর পুরো বাকলিয়া এলাকায় থমথমে ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ওই এলাকায় বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত পুলিশ ও দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, যেকোনো অপরাধেরই সুষ্ঠু তদন্ত হবে এবং অপরাধীকে কঠোর আইনের আওতায় আনা হবে। তবে কোনো অবস্থাতেই সাধারণ জনগণকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না।
মিরপুরের পল্লবীতে ৮ বছরের রামিসার ক্ষতবিক্ষত মরদেহের শোক কাটতে না কাটতেই চট্টগ্রামে ৩ বছরের শিশুর ওপর এই পাশবিকতা প্রমাণ করে—আমাদের দেশের শিশুরা এখন কতটা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। লম্পট ও ধর্ষকদের যদি দ্রুততম সময়ে প্রকাশ্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দেওয়া হয়, তবে বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের এই অনাস্থা ও গণপিটুনির প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।
আঞ্চলিক প্রতিনিধি