ইরানের সদ্যপ্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বিদায়ী রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে সাধারণ নাগরিকদের ঢল, বুক ফাটা কান্না ও স্বতঃস্ফূর্ত শোক প্রকাশ দেখে গভীর বিস্ময় প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করেছেন, খামেনিকে নিয়ে তাঁর আগের ধারণা ভুল ছিল। ট্রাম্পের ভাষায়, “আমি ভেবেছিলাম ইরানের সাধারণ মানুষ তাদের এই নেতাকে তীব্র ঘৃণা করে।”
আজ রোববার (৫ জুলাই) পাকিস্তানের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘ডন’ (Dawn)-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানানো হয়েছে।
‘হয়তো ওগুলো ভুয়া কান্না’: অ্যাক্সিওসকে ট্রাম্প
মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ (Axios)-কে দেওয়া একটি বিশেষ টেলিফোন সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বর্তমান শোকাবহ পরিস্থিতি এবং লাখ লাখ মানুষের সমাগম নিয়ে নিজের এই প্রতিক্রিয়ার কথা জানান। তেহরানে খামেনির কফিনের সামনে ইরানিদের কান্নার দৃশ্য দেখে নিজের ক্ষোভ ও বিস্ময় লুকিয়ে রাখতে পারেননি ট্রাম্প। দৃশ্যটি নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য ছিল, “হতে পারে এগুলো স্রেফ ভুয়া কান্না (Fake Tears)।”
‘এক আঘাতেই সবাইকে শেষ করতে পারি, কিন্তু করব না’
একই সাক্ষাৎকারে চিরচেনা আক্রমণাত্মক ও দম্ভোক্তি সুরে ট্রাম্প দাবি করেন, খামেনির জানাজায় অংশ নেওয়া ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (IRGC) প্রধানসহ সমস্ত মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার পূর্ণ সামরিক সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।
ট্রাম্পের ভাষায়:
“তারা (ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব) সবাই এখন এক জায়গায় জড়ো হয়েছে। একটি মাত্র নিখুঁত সামরিক আঘাতেই আমরা তাদের সবাইকে একসাথে শেষ করে দিতে পারি।”
তবে চরম এই সামরিক হুমকি দেওয়ার পরপরই ট্রাম্প যোগ করেন যে, এমন কোনো ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপ তিনি এই মুহূর্তে নিতে চান না। কারণ তেমন কিছু করলে পরবর্তীতে যুদ্ধ থামানোর জন্য বা দ্বিপক্ষীয় কোনো চুক্তিতে আসার জন্য ওপাশে কথা বলার মতো আর কোনো মানুষই অবশিষ্ট থাকবে না। মূলত এই কূটনৈতিক আলোচনার স্বার্থেই তিনি এই ধরনের সামরিক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও হামলা চালানো থেকে বিরত থাকছেন।
১ সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতি ও চুক্তির আকুতি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অ্যাক্সিওসকে আরও জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের উভয় পক্ষই খামেনির শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সব ধরনের দ্বিপক্ষীয় আলোচনা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার যৌথ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতির রূপরেখা স্পষ্ট করে ট্রাম্প বলেন, “জানাজা ও শেষকৃত্যের এই রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান চলাকালীন কোনো পক্ষই একে অপরের ওপর কোনো ধরনের গুলিবর্ষণ বা সামরিক হামলা চালাবে না।” তিনি দাবি করেন, তেহরান এখন ওয়াশিংটনের সাথে একটি স্থায়ী চুক্তির জন্য রীতিমতো ব্যাকুল বা মরিয়া হয়ে উঠেছে। আর আমেরিকার ‘মহানুভবতা’ ও সদ্ব্যবহারের অংশ হিসেবেই জানাজা সম্পন্ন করার জন্য ইরানিদের এই এক সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি বা ছাড় দেওয়া হয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই বক্তব্য যেমন তাঁর স্বভাবসুলভ অহংকারকে প্রকাশ করে, তেমনি এটি পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ‘ইরানসংক্রান্ত’ ভুল হিসাব-নিকাশেরও এক বড় প্রমাণ। খামেনির মৃত্যুর পর আমেরিকানরা ভেবেছিল ইরানের মানুষ হয়তো রাস্তায় নেমে উল্লাস করবে, কিন্তু তেহরানের রাজপথে ১ কোটিরও বেশি মানুষের কান্নার ঢল ট্রাম্প প্রশাসনকে এক বড় ধাক্কা দিয়েছে। জানাজার মঞ্চে পুরো ইরানি লিডারশিপকে এক আঘাতেই উড়িয়ে দেওয়ার যে হুমকি ট্রাম্প দিয়েছেন, তা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। তবে এক সপ্তাহের এই অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি প্রমাণ করে যে, খামেনি-পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে একটি বড় আকারের আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়াতে পর্দার আড়ালে ওয়াশিংটন ও তেহরান দুই পক্ষই অত্যন্ত সাবধানে ঘুঁটি চালছে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক