ঢাকা | | বঙ্গাব্দ

ময়মনসিংহে গলা কেটে হত্যা: সহোদর ৪ ভাই গ্রেপ্তার, নেপথ্যে ‘শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণের’ অভিযোগ

ময়মনসিংহে গলা কেটে হত্যা: সহোদর ৪ ভাই গ্রেপ্তার, নেপথ্যে ‘শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণের’ অভিযোগ ছবি: সংগৃহীত
ad728

ময়মনসিংহ নগরীতে রাজিব আহমেদ ওরফে রুবেল (৪০) নামে এক যুবককে অত্যন্ত নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় আপন সহোদর চার ভাইকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আজ সোমবার (৬ জুলাই) দুপুরের দিকে জেলা পিবিআই কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ময়মনসিংহ পিবিআই পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান জানান, মায়ের শ্লীলতাহানির প্রতিশোধ নিতেই রুবেলকে পরিকল্পিতভাবে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। তবে, গ্রেপ্তার চার যুবকের মা নিজে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ এনে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

গ্রেপ্তারকৃত চার ভাই হলেন— রহমত (৩০), জনি (২৮), রকি (২৬) এবং ইমরাজ (১৮)। তারা সবাই নগরীর আরকে মিশন সড়কের ৩৬ বাড়ি কলোনির বাসিন্দা।


ঘটনার সূত্রপাত ও পিবিআই-এর ভাষ্য

পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান জানান, প্রায় এক মাস আগে নিহত রাজিব আহমেদ ওরফে রুবেল আরকে মিশন সড়কের পারুল নামে এক নারীর বাসার একটি কক্ষ ভাড়া নেন। বাসা নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বাড়ির মালিক পারুল ও তার সন্তানদের সাথে ভাড়াটিয়া রুবেলের মতবিরোধ ও বিবাদ সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে পারুল তাকে বাসা ছেড়ে দেওয়ার জন্য তাগিদ দিতে থাকেন।

ঘটনার দিন রোববার (৫ জুলাই) ভোরবেলায় বাসা ছাড়া নিয়ে রুবেল ও বাড়িওয়ালা পারুলের মধ্যে তীব্র বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। পিবিআই-এর দাবি, বিবাদের একপর্যায়ে রুবেল ওই নারীর শ্লীলতাহানি করেন। মায়ের শ্লীলতাহানির কথা জানতে পেরে পারুলের চার ছেলে চরম ক্ষুব্ধ হয়ে পরিকল্পিতভাবে ভাড়াটিয়া রুবেলকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করে। ঘটনার পর পুলিশ ও পিবিআই দ্রুত অভিযান চালিয়ে ওই দিন রাতেই চার ভাইকে গ্রেপ্তার করে।


নিহতের বাবার মামলা ও ভিন্ন দাবি

এদিকে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রোববার রাতেই নিহত রুবেলের বাবা আব্দুল হামিদ বাদী হয়ে কোতোয়ালী মডেল থানায় বাড়িওয়ালা নারী পারুলসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৩-৪ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

মামলার এজাহারে বাদী দাবি করেন, বাসা ছাড়ার জন্য রুবেল কিছুটা সময় চাইলেও বাড়িওয়ালা ও তার ছেলেরা তাকে নিয়মিত প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছিলেন। গত রোববার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে বাসা ছাড়াকে কেন্দ্র করে আবারও বাগ্‌বিতণ্ডা হলে বাড়িওয়ালা ও তার ছেলেরাসহ অন্য আসামিরা জোরপূর্বক রাজিবের কক্ষে ঢোকেন। এরপর তাকে চেপে ধরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলায় উপর্যুপরি আঘাত করে হত্যা করে পালিয়ে যান। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করা হলে পুলিশ, সিআইডি ও পিবিআই সদস্যরা গিয়ে শয়নকক্ষের বিছানা থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠান।


হাসপাতালে মায়ের ভর্তি ও ‘ধর্ষণের’ চাঞ্চল্যকর তথ্য

পিবিআই সংবাদ সম্মেলনে ‘শ্লীলতাহানির’ কথা উল্লেখ করলেও গ্রেপ্তার যুবকদের মায়ের হাসপাতালে ভর্তির স্লিপে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং গুরুতর তথ্য পাওয়া গেছে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, ওই নারী রোববার দুপুর দেড়টায় ‘ধর্ষণের’ অভিযোগ এনে হাসপাতালে ভর্তি হন। ভর্তির স্লিপে কর্তব্যরত চিকিৎসকের স্বাক্ষর, হাসপাতালের সিলসহ ‘ধর্ষণ’ (Rape) বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

জানা গেছে, হাসপাতালে ভর্তির খবর পেয়ে পিবিআই-এর উপ-পরিদর্শক (এসআই) নজরুল ইসলাম ওই নারী ও তার দুই ছেলেকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে এসেছিলেন। এ বিষয়ে পিবিআই পুলিশ সুপার জানান, তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় চার আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ওই নারীকে চিকিৎসার জন্য আবারও হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

ময়মনসিংহের এই হত্যাকাণ্ডটি অত্যন্ত জটিল এবং স্পর্শকাতর মোড় নিয়েছে। একদিকে নিহতের বাবার দায়ের করা ঠান্ডা মাথার দলবদ্ধ হত্যাকাণ্ড ও বাসা নিয়ে বিরোধের অভিযোগ; অন্যদিকে আসামিপক্ষের মায়ের শ্লীলতাহানি ও খোদ হাসপাতালের নথিতে লিখিত ‘ধর্ষণের’ গুরুতর তথ্য। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে গলা কেটে হত্যা করা যেমন চরম ফৌজদারি অপরাধ, তেমনি একজন নারীর সম্ভ্রমহানি বা ধর্ষণের ঘটনাও সমাজে এক দণ্ডনীয় অপরাধ।  পিবিআই ও পুলিশ প্রশাসনকে কোনো একতরফা তত্ত্বে আটকে না থেকে অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। ওই নারীর মেডিকেল টেস্টের চূড়ান্ত রিপোর্ট এবং হত্যাকাণ্ডের পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণ মিলিয়ে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা জরুরি, যাতে নিরপরাধ কেউ সাজা না পায় এবং প্রকৃত অপরাধীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়।


সর্বশেষ সংবাদ
হরমুজ প্রণালি চিরতরে বন্ধের হুঁশিয়ারি: নতুন অস্থিরতার আশঙ্কা

হরমুজ প্রণালি চিরতরে বন্ধের হুঁশিয়ারি: নতুন অস্থিরতার আশঙ্কা