চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (এমপি) শাহজাহান চৌধুরীকে লক্ষ্য করে হামলার পরিকল্পনার একটি গোপন অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ফাঁস হওয়া ওই অডিওতে এমপিকে সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় প্রবেশ করতে না দেওয়া এবং আসলে পায়ে গুলি করার মতো মারাত্মক হুমকি ও হামলার পরিকল্পনার কথা শোনা গেছে। এই ঘটনা ফাঁসের পর স্থানীয় রাজনীতি এবং প্রশাসনের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে, অডিওতে কথোপকথন চালানো দুই ব্যক্তির মধ্যে একজন হলেন স্বোদ এমপির পিএ আরমান উদ্দিন এবং অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তি হলেন লোহাগাড়া সদর ইউনিয়নের রশিদার পাড়া এলাকার বাসিন্দা ও যুবদল কর্মী মো. তারেকুল হক।
‘এখানে আরমান সাহেবের কথাই চলবে, আসলে পায়ে গুলি করব’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ওই অডিও রেকর্ডে যুবদল নেতা তারেকুলকে অত্যন্ত উগ্র ভাষায় বলতে শোনা যায়:
“লোহাগাড়ায় এমপি কেন আসবে? আসলে পায়ে গুলি করে জিজ্ঞেস করব কেন এসেছে। এখানে আরমান সাহেবের কথাই চলবে।”
হুমকির জবাবে এমপির পিএ আরমান উদ্দিনকে সুর মিলিয়ে বলতে শোনা যায়, “এমপিকে তো লোহাগাড়ায় না আসতে বলি। তারপরেও লোকজনের জ্বালায় আসে।”
কথোপকথনের এক পর্যায়ে যুবদল নেতা তারেকুল অবৈধ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত থাকার কথা উল্লেখ করলে জবাবে আরমান উদ্দিন তাকে কিছুটা সতর্ক করে বলেন, “এসব করলে পুলিশ আসবে, আর্মি আসবে, এমপি আসবে।”
নেপথ্যে অবৈধ বালুমহাল ও পাহাড় কাটার সিন্ডিকেট!
স্থানীয়দের দাবি, এই অডিও ফাঁসের ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে এলাকার অবৈধ বালু উত্তোলন ও পাহাড় কাটার নিয়ন্ত্রণ। অডিওতে কথা বলা যুবদল কর্মী তারেকুল হক লোহাগাড়া এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলন ও পাহাড়ের মাটি কাটার সঙ্গে জড়িত একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী চক্রের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।
অপরদিকে, খোদ এমপি শাহজাহান চৌধুরীর পিএ আরমান উদ্দিনের বিরুদ্ধেও স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে বালুমহাল এবং পাহাড়ের মাটি কাটা নিয়ে প্রভাব খাটানো ও বড় ধরনের তদবির বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
অতিরিক্ত এসপির হোয়াটসঅ্যাপে তদবিরের প্রমাণ, তদন্তে পুলিশ
এ বিষয়ে সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী জানান, এই অডিও বা হামলার পরিকল্পনার ঘটনার সাথে তাঁর ব্যক্তিগত কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তবে তিনি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর একটি তথ্য দিয়ে বলেন, আরমান নামের ওই ছেলেটি (এমপির পিএ) বিভিন্ন অবৈধ ও বিতর্কিত ইস্যুতে তাঁর কাছে তদবির করতেন, যার স্পষ্ট প্রমাণ তাঁর ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপে (WhatsApp) সংরক্ষিত রয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মাসুদ আলম অডিওটি পাওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমের কাছে নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, পুরো বিষয়টি বর্তমানে জেলা পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে যাচাই-বাছাই ও তদন্ত করছে।
তবে এই স্পর্শকাতর অডিও ফাঁসের ঘটনায় অভিযুক্ত পিএ आरমান উদ্দিন সাংবাদিকদের কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অন্যদিকে ঘটনা ফাঁসের পর থেকে অভিযুক্ত যুবদল কর্মী মো. তারেকুল হকের মুঠোফোনটি সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় তাঁর কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
একজন দায়িত্বরত সংসদ সদস্যের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করা এবং তাঁরই পিএ-র এমন অডিও ফাঁসের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এর পেছনে যদি লোহাগাড়ার অবৈধ বালুমহাল ও পাহাড় কাটার সিন্ডিকেট জড়িত থাকে, তবে অবিলম্বে এই চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার করা উচিত। এমপির পিএ যদি প্রশাসনের কাছে অবৈধ তদবির করে থাকেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধেও দলীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। 'মাটি ও জনতার কথা' আশা করে, পুলিশ প্রশাসন দ্রুত এই অডিওর সত্যতা নিশ্চিত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনবে।
শিক্ষা প্রতিবেদক