ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬-এর উন্মাদনা এবার ছুঁয়ে গেল লাল-সবুজের বাংলাদেশকে, তাও আবার খোদ উত্তর আমেরিকার জমকালো উদ্বোধনী মঞ্চে! ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিন দেশে (যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা) আয়োজিত এই মহোৎসবের প্রতিটি ভেন্যুতেই বসছে উদ্বোধনী আসর। আর গত শনিবার (১২ জুন) কানাডার টরন্টো স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিল্পী হিসেবে পারফর্ম করে ইতিহাস গড়েছেন তরুণ সংগীতশিল্পী ও প্রযোজক সঞ্জয় (Sanjay)।
বিশ্বখ্যাত বলিউড তারকা নোরা ফাতেহি এবং ফরাসি হিপ-হপ শিল্পী ভেভেড্রিমের (Vavedream) সঙ্গে একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন সঞ্জয়। তাঁদের এই চোখধাঁধানো পারফরম্যান্সের সময় পুরো স্টেডিয়ামের গ্যালারি দর্শনার্থীদের তুমুল করতালিতে ফেটে পড়ে।
টরন্টো স্টেডিয়ামে কানাডার উদ্বোধনী ম্যাচ শুরুর ঠিক ৯০ মিনিট আগে শুরু হয় এই মেগা অনুষ্ঠান। শুরুতে কানাডার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে আদিবাসী বংশোদ্ভূত গায়ক উইলিয়াম প্রিন্স মনমুগ্ধকর পরিবেশনা উপহার দেন। এরপর মঞ্চে আসেন সঞ্জয়, নোরা ফাতেহি ও ভেভেড্রিম।
তাঁরা ফিফার সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত অফিশিয়াল গান ‘সির সির’ (Sir Sir) পরিবেশন করেন। গত ৮ জুন ফিফার অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে গানটি অবমুক্ত হওয়ার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মাত্র ৪ দিনেই ইউটিউবে ভিডিওটির ভিউ ছাড়িয়েছে ৩ কোটি ৮৩ লাখ!
একই উদ্বোধনী মহোৎসবে আরও সুরের জাদু ছড়ান কানাডিয়ান সংগীতের মহারথী মাইকেল বুবলে, অ্যালানিস মরিসেট, আলিসিয়া কারার পাশাপাশি জেসি রেয়েজ এবং ফিলিস্তিনি জনপ্রিয় গায়িকা এলিয়ানা।
স্লিভে টাইগার, শাপলা ও জাতীয় পতাকা: প্রশংসায় ভাসছেন সঞ্জয়
টরন্টো স্টেডিয়ামে পারফরম্যান্সের চেয়েও বেশি আলোচনা ও প্রশংসা কুড়াচ্ছে বিশ্বমঞ্চে সঞ্জয়ের দেশাত্মবোধ ও অভিনব উপস্থাপনা। পারফর্ম করার সময় সঞ্জয়ের গায়ে ছিল বিশেষভাবে তৈরি একটি স্টাইলিশ জ্যাকেট।
শেকড়ের নকশা: জ্যাকেটের ডান হাতের স্লিভে অত্যন্ত নিখুঁত এম্ব্রয়ডারির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল বাংলাদেশের জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগার, জাতীয় ফুল শাপলা এবং সবুজের বুকে লাল বৃত্ত সংবলিত জাতীয় পতাকা।
গর্বের প্রদর্শন: গান গাওয়ার সময় সঞ্জয় বারবার নিজের হাতের স্লিভের দিকে আঙুল নির্দেশ করে বৈশ্বিক দর্শকদের সামনে বাংলাদেশের এই নকশাগুলো প্রদর্শন করছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সঞ্জয়ের এই গর্বিত মুহূর্তের ভিডিও এবং ছবি ইতিমধ্যে ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে। আন্তর্জাতিক এত বড় একটি মঞ্চে নিজের দেশকে ভুলে না গিয়ে এমন নান্দনিক উপায়ে রিপ্রেজেন্ট করায় দেশ-বিদেশের লাখো নেটিজেন ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাঁকে প্রশংসায় ভাসাচ্ছেন।
শ্রীমঙ্গল থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস: সঞ্জয়ের সফলতার গল্প
সঞ্জয়ের জন্ম বাংলাদেশের চায়ের রাজধানী খ্যাত সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলে। তবে তাঁর শৈশবের একটি বড় ও রঙিন অংশ কেটেছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। এরপর পরিবারের সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক এই শিল্পী বাংলা লোকজ ও আধুনিক সংগীতের উপাদানকে ইলেকট্রনিক সাউন্ড বা ইডিএম (EDM)-এর সঙ্গে ফিউশন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র পরিচিতি তৈরি করেছেন।
শেকড়ের প্রতি প্রবল টানের কারণে সঞ্জয় দেশীয় সংগীতেও নিয়মিত অবদান রাখছেন:
বিপিএল ২০২৫: বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) ২০২৫-এর অফিশিয়াল থিম সং-এ নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি।
বলিউড সংযোগ: আন্তর্জাতিক কাজের অংশ হিসেবে বলিউডের মেলোডি কুইন শ্রেয়া ঘোষালের সঙ্গেও কাজ করেছেন এই গুণী প্রযোজক।
দেশীয় তারকাদের সাথে কাজ: বাংলাদেশের শীর্ষ তারকাদের সঙ্গে সঞ্জয়ের জুটির গানগুলো ইউটিউবে কোটি কোটি ভিউ পেয়েছে। ২০২৪ সালে মুক্তি পাওয়া হাবিব ওয়াহিদ, মুজা ও সঞ্জয় ত্রয়ীর ‘একলা দুনিয়া’ গানটি ৩৭ লাখের বেশি, তাহসান খানের সঙ্গে ‘ভুলে যাব’ গানটি ২৪ লাখ এবং পপ তারকা জেফারের সঙ্গে সঞ্জয়ের ‘আড়ালে হারালে’ গানটি ইতিমধ্যে ৬৫ লাখ বারের বেশি দেখা হয়েছে।
ফুটবল বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দল খেলতে না পারলেও, আমাদের শ্রীমঙ্গলের সন্তান সঞ্জয় যেভাবে কোটি মানুষের সামনে বুকের ওপর রয়েল বেঙ্গল টাইগার আর লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে নোরা ফাতেহির সাথে গলা মেলালেন—তা প্রতিটা বাংলাদেশির জন্য এক চরম গর্বের মুহূর্ত। সংগীতের কোনো সীমানা নেই, আর সঞ্জয় সেটিই প্রমাণ করলেন। বিশ্বমঞ্চে এই অনন্য গৌরবের জন্য সঞ্জয়কে ‘মাটি ও জনতার কথা’ পরিবারের পক্ষ থেকে লাল-সবুজ সালাম ও আন্তরিক অভিনন্দন!
বিনোদন ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ডেস্ক