বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আরও একটি মেগাপ্রকল্পে নজিরবিহীন লুটপাট ও দুর্নীতির ভয়ংকর চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ও আনোয়ারাকে যুক্ত করা দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম আন্ডারওয়াটার ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল’ (কর্ণফুলী টানেল) নির্মাণে ১ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার বিশাল আর্থিক অনিয়ম ও হরিলুট চিহ্নিত করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়।
১০ হাজার ৬৮৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই মেগাপ্রকল্প নিয়ে সম্প্রতি এক চাঞ্চল্যকর মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। সেই প্রতিবেদনেই সরকারি অর্থ অপচয় ও নীতিগত অনিয়মের এই হাড়হিম করা তথ্য উঠে এসেছে।
গাছ না লাগিয়েই ৪৮ কোটি টাকা সাবাড়, ৫০৪ কোটির বিলাসী ‘সার্ভিস এরিয়া’
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের ব্যয়ের খাতগুলোতে চোখ কপালে ওঠার মতো সব অনিয়ম করা হয়েছে:
ভুয়া বনায়ন: ২০২২-২৩ অর্থবছরে ল্যান্ডস্কেপিং ও গাছ লাগানোর নামে কাগজে-কলমে ৪৮ থেকে ৪৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা খরচ দেখানো হলেও বাস্তবে প্রকল্প এলাকায় একটি গাছও লাগানো হয়নি! সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) এই কাজের কোনো প্রমাণই নেই।
বিলাসী সার্ভিস এরিয়া: টানেলের মূল উদ্দেশ্যের বাইরে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়ভাবে ৫০৪ কোটি টাকা খরচ করে একটি বিশাল ‘সার্ভিস এরিয়া’ নির্মাণ করা হয়েছে। এই এলাকায় বাংলো, মোটেল, কনভেনশন সেন্টার, চিকিৎসাকেন্দ্র এবং একটি জাদুঘর তৈরি করা হয়েছে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এসব বিলাসবহুল স্থাপনার সাথে টানেলের সরাসরি কোনো সড়ক সংযোগই নেই! আইএমইডি এই খরচকে ‘পুরোপুরি অপচয় ও নীতিগত অনিয়ম’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
অন্যান্য প্রধান আর্থিক অনিয়মসমূহ
আইএমইডির মূল্যায়ন অনুযায়ী, গত তিন অর্থবছরে এই প্রকল্পে ৬৮টি অডিট আপত্তি অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে, যার মধ্যে ৪৮টিই ‘গুরুতর আর্থিক অনিয়ম’। ১. একই ধরনের খরচ জেনারেল ফ্যাসিলিটিজ তহবিলে থাকা সত্ত্বেও কন্টিনজেন্সি বা আপৎকালীন তহবিল থেকে ২২৫ কোটি টাকা ওড়ানো হয়েছে। ২. নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে ২২৪ কোটি টাকার অননুমোদিত মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। ৩. আলাদা তদারকি পরামর্শক থাকার পরও পরামর্শক ফি বাবদ অতিরিক্ত ৭০ কোটি ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। ৪. বরাদ্দের বাইরে অতিরিক্ত ৯০ কোটি টাকা প্রদান এবং গাড়ি কেনায় দুর্নীতি করা হয়েছে। প্রকল্পের জন্য কেনা ২৯টি গাড়ির মধ্যে মাত্র ৬টি সেতু বিভাগকে দেওয়া হয়েছে, বাকি ২৩টি গাড়ি আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অব্যবহৃত পড়ে নষ্ট হচ্ছে।
৪ বার পিডি বদল ও ২৬% ব্যয় বৃদ্ধি
সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন এবং চুক্তির শর্ত ভঙ্গের কারণেই এই মেগাপ্রকল্পের চূড়ান্ত খরচ প্রাথমিক অনুমোদনের (৮ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা) চেয়ে ২৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১০ হাজার ৬৯০ কোটি টাকায় ঠেকেছে এবং সময় লেগেছে দ্বিগুণ। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ৫০ কোটি টাকার বেশি প্রকল্পের জন্য সার্বক্ষণিক প্রকল্প পরিচালক (PD) থাকা বাধ্যতামূলক হলেও এই প্রকল্পে কাজ চলাকালে ৪ জন পিডি পরিবর্তন করা হয়েছে। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী ২ বছর ধরে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পিডির কাজ চালিয়েছেন, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা নষ্ট করেছে। উল্লেখ্য, এই প্রকল্পের জন্য চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক ৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে, যা ১৫ বছরে শোধ করতে হবে।
সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের চরম ভুল: দৈনিক লোকসান ১০ লাখ টাকা
দুর্নীতির পাশাপাশি টানেলটি এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারের জন্য। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের (Feasibility Study) সময় দাবি করা হয়েছিল, ২০২৫ সাল নাগাদ প্রতিদিন গড়ে ২৮ হাজার ৩০৫টি গাড়ি এই টানেল ব্যবহার করবে। কিন্তু বাস্তবে পণ্যবাহী ভারী যানবাহন এই পথ সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলছে।
বর্তমানে প্রতিদিন মাত্র ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার হালকা যানবাহন টানেলটি ব্যবহার করছে—যা পূর্বাভাসের মাত্র ১৪ শতাংশ। ২০২৩ সালের উদ্বোধনের পর প্রথম দিকে দিনে ৫-৬ হাজার গাড়ি চললেও ২০২৬ সালের শুরুতে তা কমে মাত্র ৩,৪২২টিতে নেমে এসেছে। ফলে প্রতিদিন টানেল পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণে ২২ লাখ টাকা খরচ হলেও টোল আদায় হচ্ছে মাত্র ১২ লাখ টাকা। প্রতিদিনের এই ১০ লাখ টাকা লোকসান বা ঘাটতি মেটাতে এখন প্রতি বছর সরকারকে সাড়ে ৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের 'উন্নয়নের ধুয়া' তুলে করা মেগাপ্রকল্পগুলো যে আসলে একেকটি মেগা-লুটপাটের খনি ছিল, কর্ণফুলী টানেল তার জীবন্ত প্রমাণ। দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম আন্ডারওয়াটার টানেলের গৌরব আজ প্রতিদিন ১০ লাখ টাকার লোকসান আর ভুয়া বনায়নের ৪৮ কোটি টাকা চুরির অপবাদে ধুলায় মিশে গেছে। দেশের টাকা বিদেশে পাচার আর আমলাদের আমোদ-প্রমোদের জন্য ৫০৪ কোটি টাকার সংযোগহীন বাংলো-মোটেল বানানো চরম অপরাধ। যে ৪ জন প্রকল্প পরিচালক এবং সেতু কর্তৃপক্ষের আমলারা এই হরিলুটের সাথে জড়িত ছিলেন, তাদের অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনি প্রক্রিয়ায় আনা উচিত। চীনের এই কঠিন শর্তের ঋণ এখন দেশের সাধারণ মানুষকে করের টাকা দিয়ে শোধ করতে হবে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
স্টাফ রিপোর্টার