গণচীন সফরের অংশ হিসেবে রাজধানী বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফলপ্রসূ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অত্যন্ত আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই শীর্ষ বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে অর্থনীতি, বাণিজ্য ও অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২টি চুক্তি এবং ১৩টি সমঝোতা স্মারক (MoU) সই হয়েছে।
লালগালিচা সংবর্ধনা ও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা
আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) স্থানীয় সময় বিকেল ৫টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন থেকে মোটর শোভাযাত্রা সহকারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ পৌঁছালে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও স্বাগত জানান।
গার্ড অব অনার: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় লালগালিচা দিয়ে অভিবাদন মঞ্চে নিয়ে যান লি কিয়াং। এ সময় চীনের সশস্ত্র বাহিনীর একটি সুসজ্জিত চৌকস দল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সশস্ত্র সালাম (গার্ড অব অনার) প্রদান করে।
তোপধ্বনি ও প্যারেড: দুই দেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সম্মান জানিয়ে ঐতিহ্যবাহী তোপধ্বনি দেওয়া হয়। এরপর দুই প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনীর সুসজ্জিত প্যারেড পরিদর্শন করেন।
২ চুক্তি ও ১৩টি সমঝোতা স্মারক সই
প্যারেড পরিদর্শন শেষে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বিষয়ক মোট ১৫টি দ্বিপাক্ষিক দলিল (২টি চুক্তি ও ১৩টি সমঝোতা স্মারক) সই হয়। এর মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাল বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিনিয়োগ আকর্ষণ ও ঠাসা সূচি
দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ছাড়াও আজ বেইজিংয়ে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান।
বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম: তিনি চীনের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেন। এছাড়াও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং বেইজিংয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’-এর বিশেষ সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিয়ে চীনা ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
মন্ত্রীদের সাথে বৈঠক: শুধু চীনা প্রধানমন্ত্রীই নন, আজ চীনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর আলাদা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
দালিয়ান থেকে বুলেট ট্রেনে বেইজিং আগমন
এর আগে চীনের দালিয়ান প্রদেশে ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরামের (WEF) বার্ষিক সম্মেলনে যোগদান শেষে গতকাল বুধবার (২৪ জুন) বিকেলে বিখ্যাত বুলেট ট্রেনে চড়ে বেইজিং পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বেইজিং রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মেই তাঁকে বর্ণাঢ্য লালগালিচা সংবর্ধনা এবং গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, দালিয়ানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরামের এই সম্মেলনে বিশ্বের ৯০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলের প্রায় ১ হাজার ৭০০ রাজনৈতিক নেতা, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ এবং গণমাধ্যম প্রতিনিধি অংশ নেন। সেখানে মূল অধিবেশন ছাড়াও সাইডলাইন বৈঠকে কাজাখস্তানসহ বেশ কয়েকটি দেশের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
আগামীকাল শি জিনপিংয়ের সাথে বৈঠক
সফরের শেষ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে আগামীকাল শুক্রবার (২৬ জুন) চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই রাষ্ট্রীয় বৈঠক ও আনুষ্ঠানিকতা শেষে আগামীকালই ঢাকার উদ্দেশে বেইজিং ছাড়ার কথা রয়েছে তাঁর।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠা এবং নতুন করে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর এই চীন সফর অত্যন্ত সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ। ভূ-রাজনীতির সমীকরণ মাথায় রেখে চীনের সাথে দুটি চুক্তি ও ১৩টি সমঝোতা স্মারক সই হওয়া দেশের বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে। 'মাটি ও জনতার কথা' মনে করে, ওয়ান-বেল্ট-ওয়ান-রোড উদ্যোগের এই যুগে চীনের এই রাজকীয় তোপধ্বনি ও লালগালিচা সংবর্ধনা প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের গ্রহণযোগ্যতা ও কূটনৈতিক মর্যাদা কতটা শক্তিশালী।
বিশেষ কূটনৈতিক প্রতিবেদক