বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান ও কৌশলগত রুট হরমুজ প্রণালির ওপর টহলরত একটি অত্যাধুনিক মার্কিন সামরিক অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করেছে ইরান। এই ঘটনার পরপরই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জোরালো হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গত মঙ্গলবার (৯ জুন) রাতে নিজের প্রতিষ্ঠিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ (Truth Social) দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এই কড়া হুঁশিয়ারি বার্তা দেন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর পোস্টে ক্ষোভ উগরে দিয়ে লেখেন:
“আমাদের সামরিক বাহিনী আমাকে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে টহল দেওয়ার সময় ইরানিরা আমাদের একটি অত্যন্ত অত্যাধুনিক অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করেছে। হেলিকপ্টারটিতে দুজন পাইলট ছিলেন, সৌভাগ্যবশত তাঁরা নিরাপদ ও অক্ষত আছেন। তবে যা–ই হোক না কেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপর এই হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অবিলম্বে কঠোর ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া এখন অপরিহার্য।”
হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার এই ঘটনা ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবির বিষয়ে তেহরান বা ইরানের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত অফিশিয়াল কোনো মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘আল জাজিরা’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার সংঘাত গত কয়েক মাস ধরে চরম আকার ধারণ করেছে।
যৌথ হামলা ও অবরোধ: চলতি বছরের গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথভাবে সামরিক হামলা শুরু করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রতিক্রিয়ায় বৈশ্বিক খনিজ তেল ও জ্বালানি সরবরাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় ইরান।
টহল বনাম হামলা: হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হওয়ার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মার্কিন সেনাবাহিনী সেখানে নিয়মিত আকাশপথে টহল দেওয়া শুরু করে। আর সেই ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার সেখানে টহল দিতে গেলে মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টারটি লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইরান।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য, মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হওয়ার ঠিক একদিন আগে ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যেও বড় ধরনের পাল্টাপাল্টি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছিল। পরবর্তীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সরাসরি মধ্যস্থতা ও হস্তক্ষেপে দুই দেশ সাময়িকভাবে হামলা বন্ধ করতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা পার হতে না হতেই এবার সরাসরি মার্কিন হেলিকপ্টারে ইরানের এই আঘাত পরিস্থিতিকে আবারও যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছে।
এই হেলিকপ্টার বিধ্বস্তের ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানানোর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই ইরান প্রসঙ্গে বেশ ইতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “আমরা ইরানের সঙ্গে চমৎকার একটি ঐতিহাসিক চুক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছি। এই চুক্তি কোনোভাবেই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেবে না। চুক্তিটি সই হওয়ার দুই–তিন দিনের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রশাসনের ‘চূড়ান্ত বিজয়’ ঘোষণা করা হতে পারে।”
তবে ট্রাম্পের এই আশাবাদের মাঝেই মার্কিন হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার ঘটনাটি দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও সম্ভাব্য চুক্তিকে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিল। চুক্তি সম্পাদনের দ্বারপ্রান্তে এসে খোদ মার্কিন বাহিনীর ওপর ইরানের এই সরাসরি হামলাকে বড় ধরনের উসকানি হিসেবে দেখছে হোয়াইট হাউস।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা মানেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের বিপর্যয়। একদিকে ট্রাম্প যখন দুই সপ্তাহের মধ্যে ইরানের সাথে ‘চূড়ান্ত চুক্তি ও বিজয়ের’ কথা বলছেন, অন্যদিকে ঠিক তখনই মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করে ইরান স্পষ্ট বার্তা দিল যে তারা সহজে নতি স্বীকার করবে না। দুই পাইলট বেঁচে গেলেও, মার্কিন অহংকারে আঘাত লাগায় ট্রাম্পের পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপ কী হয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক