কান্নারত শিশুকে হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে একজন মাদকাসক্ত পিতার বিরুদ্ধে।
ফেনীর ফুলগাজী উপজেলায় ঘরের ভেতর কান্না করায় নিজের মাত্র দুই মাস বয়সি অবুঝ সন্তানকে মেঝেতে আছাড় দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে এক পাষণ্ড বাবার বিরুদ্ধে। নিহত শিশুর নাম মোহাম্মদ জুনায়েদ। এই চরম অমানবিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনার পর শিশুটির মা রুনা আক্তারের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ঘাতক বাবা মো. সুলতানকে আটক করেছে পুলিশ।
গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সন্ধ্যা ৭টার দিকে ফুলগাজী ভূমি অফিস সংলগ্ন মেম্বার কলোনির একটি ভাড়া বাসায় এই শিউরে ওঠার মতো ঘটনা ঘটে।
অভিযুক্ত সুলতান নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার কাত্রা ডাকঘর এলাকার কিতাব আলীর ছেলে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই বছর আগে নেত্রকোনার একই উপজেলার নৌকা বাহাড়তলা গ্রামের আবুল কাশেমের মেয়ে রুনা আক্তারের সঙ্গে সুলতানের বিয়ে হয়। বিয়ের পর জীবিকার তাগিদে তাঁরা ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার ভূমি অফিস সংলগ্ন মেম্বার কলোনিতে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন। মাত্র দুই মাস আগে তাঁদের কোল আলো করে জন্ম নিয়েছিল ফুটফুটে শিশু মোহাম্মদ জুনায়েদ। কিন্তু কে জানত, জন্মদাতার হাতেই অকালে ঝরে যাবে এই নিষ্পাপ প্রাণ!
নিহত শিশুর মা রুনা আক্তার অভিযোগ করে বলেন, সুলতান দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মকভাবে মাদকাসক্ত। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে রুনা কাজের প্রয়োজনে ঘরের কিছুটা বাইরে ছিলেন। এ সময় শিশু জুনায়েদ ঘরে তার বাবার কাছেই ছিল। হঠাৎ শিশুটি ক্ষুধার্ত বা অন্য কোনো কারণে বারবার কান্না শুরু করলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে মাদকাসক্ত সুলতান। একপর্যায়ে সে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুই মাসের শিশুটিকে সজোরে মাটিতে আছড়ে ফেলে।
রুনা আক্তার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আরও জানান, “আমি ঘরে ফিরে দেখতে পাই আমার কলিজার টুকরা সন্তান মাটিতে পড়ে ছটফট করছে এবং তার তীব্র শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। আর এই নির্মম দৃশ্য দেখেও তার পাষণ্ড বাবা পাশে বসে নির্বিকারভাবে গাঁজা সেবন করছিল। শুধু তাই নয়, আমি যখন জুনায়েদকে বাঁচাতে হাসপাতালে নিয়ে যেতে চাচ্ছিলাম, সে আমাকে বাধা পর্যন্ত দিচ্ছিল।”
পরে বাধা ডিঙিয়ে প্রতিবেশীদের সহায়তায় শিশুটিকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় মুন্সীরহাট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত ফেনী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন।
ফেনী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তানভীর মাহমুদ বলেন, “হাসপাতালে আনার অনেক আগেই শিশুটির মৃত্যু হয়েছিল। আমাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, শিশুটির মাথায় অত্যন্ত গুরুতর আঘাত লেগেছে। ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট ও নিখুঁত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।”
ফুলগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মিজানুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ দ্রুত হাসপাতাল থেকে শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ফেনী জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে। ঘটনার মূল অভিযুক্ত ঘাতক বাবাকে ইতিমধ্যে আটক করে থানা হেফাজতে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
ওসি আরও বলেন, “এই ঘটনায় নিহত শিশুর মায়ের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। ময়নাতদন্তের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর এবং তদন্ত সাপেক্ষে আসামির বিরুদ্ধে পরবর্তী কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”
একটি দুই মাসের অবুঝ শিশু যে এখনো পৃথিবীর আলো-বাতাস ভালো করে দেখেনি, তার কান্না থামানোর অপরাধে জন্মদাতার এমন পাশবিক আচরণ পুরো সমাজ ব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। মাদকের নীল ছোবল কীভাবে একজন মানুষকে পশুর চেয়েও অধম করে তুলতে পারে, এই ঘটনা তারই এক দগদগে প্রমাণ। ‘মাটি ও জনতার কথা’ এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে এবং ঘাতক সুলতানের দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছে।
ফেনী প্রতিনিধি