ঢাকা | | বঙ্গাব্দ

মেটলাইফে চোখের জলে বিচ্ছেদ, কিন্তু ফুটবলের মহারাজা এখনও মেসিই

মেটলাইফে চোখের জলে বিচ্ছেদ, কিন্তু ফুটবলের মহারাজা এখনও মেসিই ছবি: সংগৃহীত
ad728

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার পর স্প্যানিশদের উল্লাসের মাঝেও বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের চোখ আটকে ছিল মাঠের এক প্রান্তে। সতীর্থদের এড়িয়ে ভিজে চোখে নিভৃতে মাঠ ছাড়ছেন ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলের হারের পর মেসির সেই নীরব কান্না ছিল কোনো রূপকথার সমাপ্তিতে ট্র্যাজেডির সুর। তবে ট্রফি স্পেনের হাতে উঠলেও এবং টুর্নামেন্ট সেরার ‘গোল্ডেন বল’ রদ্রির ঝুলিতে গেলেও ফুটবল বিশ্বের সর্বজনীন সত্যটি বদলায়নি—ইতিহাসের পাতায় সর্বকালের সেরা (GOAT) হিসেবেই রয়ে গেছেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক।


ফাইনালে স্প্যানিশ দেয়াল ও বয়সকে হার মানানো এক আসর

পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে ৩৯ বছর বয়সেও সময়কে পেছনে ফেলেছিলেন মেসি। গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়ার বিপক্ষে চোখধাঁধানো হ্যাটট্রিকসহ আটটি গোল করে সীমিত শক্তির আর্জেন্টিনা দলকে একাই টেনে এনেছিলেন ফাইনালে। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লাউতারো মার্তিনেজের জয়সূচক গোলটিতেও ছিল তাঁর সেই জাদুকরী অ্যাসিস্ট।

তবে ফাইনালে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দুর্দান্ত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ স্পেনের সামনে কিছুটা নিষ্প্রভ ছিলেন মেসি। স্পেনের টানা ৩৮ ম্যাচ অপরাজিত থাকার বিশ্বরেকর্ড গড়ার দিনে ১২০ মিনিটে মাত্র ৫৪ বার বল স্পর্শ করতে পারেন তিনি। কিন্তু একটি ফাইনালের পারফরম্যান্স কখনোই গত ২০ বছর ধরে রাজত্ব করা এই মহাতারকাকে সংজ্ঞায়িত করতে পারে না।


পরিসংখ্যান ও রেকর্ডের পাতায় অনন্য উচ্চতা

মেসির ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যানই তাঁকে ফুটবলের বাকি সব কিংবদন্তি থেকে আলাদা করে দেয়:

  • জাতীয় দল: দেশের হয়ে ২০৭ ম্যাচে করেছেন ১২৫টি গোল এবং ৬৮টি অসাধারণ অ্যাসিস্ট। বিশ্বকাপে খেলেছেন রেকর্ড সর্বোচ্চ ৩৪টি ম্যাচ (২১ গোল)।

  • ক্লাব ফুটবলে একচ্ছত্র আধিপত্য: বার্সেলোনার হয়ে ১৭ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে ১০টি লা লিগা, ৪টি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ৭টি কোপা দেল রে-সহ অসংখ্য ট্রফি জিতেছেন। এরপর পিএসজি ও ইন্টার মিয়ামিতে গিয়ে বদলে দিয়েছেন ক্লাবের ইতিহাস।

  • একক সম্মাননা: রেকর্ড ৮টি ব্যালন ডি'অর, একাধিক ফিফা দ্য বেস্ট, ৬টি ইউরোপীয় গোল্ডেন শু এবং সব মিলিয়ে সর্বমোট ৪৭টি (মতান্তরে ৪৮টি) ট্রফি।


অবহেলা, অবসর থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে মহাকাব্য

২০১৬ সালে এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই কোপা আমেরিকার ফাইনাল হেরে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছিলেন মেসি। তবে এক মাসের মধ্যে ফিরে এসে ইতিহাস পুনর্লিখন শুরু করেন তিনি। ২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ ফাইনালিসিমা এবং কাতার বিশ্বকাপে দেশকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করার পর ২০২৬-এ আবারও ফাইনালে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন—মেসি শুধু গোল করেন না, তিনি সাধারণ একটি দলকেও অসাধারণ করে তুলতে পারেন।

পেলে, ম্যারাডোনা না মেসি?

পেলের তিনটি বিশ্বকাপ বা ম্যারাডোনার ৮৬-র একক জাদুকে সম্মান জানিয়েও আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে কঠিন যুগে টানা দুই দশক ধরে যেভাবে প্লেমেকিং, ড্রিবলিং ও গোলস্কোরিংয়ে রাজত্ব করেছেন মেসি, তাতে তিনি অনন্য।

মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ট্রফি হয়তো স্পেনের হয়েছে, রদ্রি পেয়েছেন টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার, কিন্তু গ্যালারি জুড়ে হাজার হাজার দর্শকের কণ্ঠে তখনও প্রতিধ্বনি হচ্ছিল একটিই নাম—‘মেসি, মেসি, মেসি...’। একটি ফাইনাল হারলেও ফুটবলের শিল্প, ধারাবাহিকতা ও প্রভাবের বিচারে লিওনেল মেসিই ফুটবলের সর্বকালের সেরা সম্রাট।

শিরোপা উঁচিয়ে বিদায় নেওয়ার চেয়ে ট্র্যাজেডি দিয়ে শেষ হওয়া গল্পগুলোর আবেদন কখনো কখনো অনেক বেশি চিরন্তন হয়। ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে মেসির পরাজয় ও চোখের জল প্রমাণ করে যে সর্বকালের সেরা মহানায়করাও রক্ত-মাংসের মানুষ।  ফুটবলের আকাশে হয়তো নতুন অনেক তারকা আসবে, কিন্তু বিগত ২০ বছর ধরে কোটি কোটি মানুষকে আনন্দ দেওয়া এবং একটি সাধারণ দলকে বিশ্বমঞ্চে বারবার ফাইনালে তোলার মতো পূর্ণাঙ্গ ফুটবল জাদুকর ফুটবলে আর কখনো নাও দেখা যেতে পারে।


আনন্দধামের উদ্যোগে বাংলা নববর্ষ উদযাপন শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠ

আনন্দধামের উদ্যোগে বাংলা নববর্ষ উদযাপন শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠ