জনগণের রক্তঘাম করা ট্যাক্সের টাকা নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এক নতুন মহোৎসব শুরু হয়েছে ‘শিক্ষার আলো ছড়ানো’র পবিত্র পোশাক পরা একটি কর্মসূচিতে। ‘দেশব্যাপী বইপড়া কর্মসূচি’-এর আড়ালে সরকারি কোষাগার থেকে কোটি কোটি টাকা লোপাটের যে নিখুঁত নীলনকশা সামনে এসেছে, তা কেবল উদ্বেগের নয়—এক চরম ধিক্কারজনক ঘটনা। জনগণের অর্থকে ‘সরকার কা মাল’ বা ‘গৌরী সেনের টাকা’ মনে করে যে বেপরোয়া হরিলুট চলছে, তার লাগাম টানবে কে?
নিজের হাটে নিজেরই সওদা: একচেটিয়া ব্যবসার ফন্দি
প্রকল্পটি পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’। কিন্তু ভেতরের খবর হলো, দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের পড়ার জন্য নির্ধারিত ৪৮টি বইয়ের মধ্যে ২৯টি বই-ই কেনা হচ্ছে খোদ বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রকাশনী থেকে! অর্থাৎ, প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে সরকারি টাকা হাতে নেওয়া এবং সেই টাকায় আবার নিজেদের প্রকাশনীর বই কেনা—একই হাতে চাল আর ডাল দুটোই মেপে পকেটে পুরে নেওয়ার নিখুঁত ফন্দি। মোট ৮টি প্রকাশনী থেকে বই কেনার বুলি ফোটানো হলেও সিংহভাগ লাভই কুক্ষিগত করা হয়েছে নির্দিষ্ট এক আঙিনায়।
‘পাইলট প্রজেক্ট’-এর দোহাই ও স্বচ্ছতার কবর
উন্মুক্ত টেন্ডার বা সাধারণ পাবলিক নোটিশের ধার ধারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। দেশের স্বনামধন্য ও গুণী লেখকদের বাদ দিয়ে, কোনো নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ প্যানেল বা নির্বাচক কমিটি ছাড়াই গোপনীয়তার আড়ালে এই কোটি কোটি টাকার বই নির্বাচনের কাজ শেষ করা হয়েছে। এ নিয়ে প্রতিবাদ জানালে জবাব মিলছে—‘এটা পাইলট প্রজেক্ট, দ্রুত করতে হচ্ছে’। প্রশ্ন হলো, পাইলট প্রজেক্ট মানেই কি অনিয়মের বৈধ লাইসেন্স? তড়িঘড়ির অজুহাতে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতাকে এভাবে সরাসরি কবর দেওয়া হলো কোন খুঁটির জোরে?
ফ্যাসিস্টদের চাটুকার ও বিতর্কিতদের পুনর্বাসন
সবচেয়ে বড় প্রতিবাদের বিষয় হলো বইয়ের তালিকা। অতীতের ফ্যাসিস্ট আমলজুড়ে যারা চাটুকারিতা করে সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নিয়েছিল, যাদের বইয়ের মান ও রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব নিয়ে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে—তাদের বইকেই আবার ঘুরপথে সরকারি বরাদ্দের তালিকায় ঠাঁই দেওয়া হয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ক্ষমতার অলিন্দের ক্ষমতাধর ব্যক্তিত্বদের ‘বিশেষ পরামর্শের’ অজুহাত দেখিয়ে এই বিতর্কিত চাটুকারদের অর্থ জুগিয়ে পুনর্বাসিত করা হচ্ছে। ক্ষমতার মসনদ পাল্টালেও ধান্দাবাজির সিন্ডিকেট যে একটুও বদলায়নি, এই ঘটনা তার স্পষ্ট প্রমাণ।
এই লুটপাট বন্ধ হোক
সচেতন পাঠক ও লেখক সমাজের সাথে প্রকাশক গোষ্টি ও স্পষ্ট ভাষায় বলতে চায়—জ্ঞানচর্চার মতো একটি মহান উদ্যোগকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেটের অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হতে দেওয়া যায় না। ক্ষমতার শীর্ষপর্যায়ের নাম ভাঙিয়ে অনিয়মকে জায়েজ করার এই পুরোনো সংস্কৃতি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
জরুরি ভিত্তিতে এই গোপনীয় ও অস্বচ্ছ কেনাকাটার চুক্তি বাতিল করতে হবে। দেশের যোগ্য ও প্রথিতযশা প্রকাশকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে, উন্মুক্ত প্রক্রিয়ায় নতুন বই নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছে সাধারণ জনগণ। শিক্ষাঙ্গন ও জ্ঞানচর্চাকে যারা ব্যবসায় পরিণত করেছে, তদন্তের মাধ্যমে তাদের মুখোশ খুলে দিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে
এস এম মহিরউদ্দিন কলি