ঢাকা | | বঙ্গাব্দ

সংসদে বাজেট : জামায়াতের ‘চানাচুর মার্কা’ বাজেট বলে কটাক্ষ; সরকারি দল ও বিএনপির প্রশংসা

সংসদে বাজেট : জামায়াতের  ‘চানাচুর মার্কা’ বাজেট বলে কটাক্ষ; সরকারি দল ও বিএনপির প্রশংসা ছবি: সংগৃহীত
ad728

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এর কড়া সমালোচনা করেছেন প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা। ঋণের বোঝা, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও কৃষকের লোকসানসহ অর্থনীতির নানা নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে তারা সরকারের প্রতি একগচ্ছ প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন দল ও শরিক বিএনপির সংসদ সদস্যরা এই বাজেটকে ‘গণমুখী ও সময়োপযোগী’ আখ্যা দিয়ে এর প্রশংসা করেছেন।

বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘চানাচুর মার্কা’ বলে তীব্র কটাক্ষ করেছেন কুষ্টিয়া-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. আমির হামজা। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন,

“এটা মূলত লুটপাটের বাজেট। এই বাজেটকে বাইরে অনেকে ‘চানাচুর মার্কা বাজেট’ বলছে; যা শুনতে ভালো লাগলেও খেলে মানুষের পেট খারাপ হয়।”

তিনি অভিযোগ করেন, রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও কর ফাঁকি রোধ, অপচয় ও প্রশাসনিক অদক্ষতা কমানোর কোনো কার্যকর পরিকল্পনা বাজেটে স্পষ্ট নয়। তিনি অর্থপাচার রোধ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পায়নে আরও জোর দিতে সরকারকে পরামর্শ দেন।


ঋণের বোঝা ২০ লাখ কোটি টাকা, মানুষের মুখ মলিন: তাজউদ্দিন খান

বাজেট দেখে দেশের সাধারণ মানুষ কোনো সমস্যার সমাধান না পাওয়ায় ‘মানুষের মুখ মলিন হয়ে গেছে’ বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আরেক সংসদ সদস্য মো. তাজউদ্দিন খান (মেহেরপুর-১)। তিনি ঋণের বোঝা, মূল্যস্ফীতি ও কৃষকের লোকসানের বিষয় তুলে ধরেন।

তাঁর বক্তব্যের মূল অংশ:

  • ঋণের পাহাড়: দেশে বর্তমানে দেশি-বিদেশি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৯ থেকে ২০ লাখ কোটি টাকা।

  • সুদের বোঝা: এবারের বাজেটে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধের জন্যই ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই বিপুল অর্থ শিক্ষা বা স্বাস্থ্যের মতো উৎপাদনশীল খাতে দিলে দেশ অনেক দূর এগিয়ে যেত।

  • জনগণের প্রত্যাশা: সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে বাজেট মূল্যায়নের দাবি তুলে তিনি বলেন, মানুষ মূলত জানতে চায় গ্যাস সিলিন্ডার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম কতটা কমল। এই বাজেটে প্রান্তিক কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাবে কি না, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।

জামায়াতের অন্য সদস্যদের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান বিদেশি ঋণ ও দারিদ্র্য বিমোচন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সরকারি ভাতা ও কার্ড দরিদ্র মানুষের কষ্ট সাময়িকভাবে কমাতে পারে, কিন্তু দারিদ্র্যের স্থায়ী সমাধান দেবে না। এছাড়া গাইবান্ধা-৫ আসনের মোহাম্মদ আব্দুল ওয়ারেস ও কুড়িগ্রাম-৪ আসনের মোস্তাফিজুর রহমান বাজেট নিয়ে বিভিন্ন অসঙ্গতি তুলে ধরেন।

বাজেট ‘গণমুখী ও হ্যান্ডসাম’: সরকারি দল ও বিএনপির পাল্টা যুক্তি

জামায়াত সদস্যদের কড়া সমালোচনার বিপরীতে সরকারি দল এবং বিএনপির সংসদ সদস্যরা বাজেটের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন।

  • বিএনপির সমর্থন: ফেনী-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মুন্সী রফিকুল আলম বাজেটকে ‘গণমুখী, সময়োপযোগী, বাস্তবধর্মী এবং জনকল্যাণমূলক’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “শুধু বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করা ঠিক নয়। সব জায়গায় বিরোধিতা করলে দেশের অর্থনীতি সামনে এগিয়ে যাবে না।” শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও কর্মসংস্থানে প্রস্তাবিত উদ্যোগ দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে বলে তিনি দাবি করেন। একইভাবে কুমিল্লা-১০ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া জানান, তিনি নিজের এলাকায় গিয়ে বাজেট নিয়ে মানুষের মধ্যে ‘চমৎকার’ প্রতিক্রিয়া দেখেছেন।

  • অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও ম্যাঙ্গো জোন: রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল হক মিলন বাজেটের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রশংসা করে বলেন, উন্নয়নের সুফল শুধু রাজধানীতে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রান্তিক অঞ্চল, চরাঞ্চল ও হাওর এলাকায় পৌঁছে দিতে হবে। রাজশাহীর আম রপ্তানি বাড়াতে সেখানে একটি আধুনিক ‘ম্যাঙ্গো এক্সপোর্ট জোন’ গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি।

  • হ্যান্ডসাম বাজেট: ময়মনসিংহ-২ আসনের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সংসদ সদস্য মোহাম্মদুল্লাহ বাজেটকে ‘হৃষ্টপুষ্ট এবং হ্যান্ডসাম’ আখ্যা দিয়ে বলেন, তবে এই বাজেট বাস্তবায়ন করাই সরকারের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ।

  • উদ্বেগ ও পরামর্শ: সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য শামসুন্নাহার বেগম শিল্প, পর্যটন ও পাট খাত পর্যাপ্ত ‘নীতিগত সহায়তা পাচ্ছে না’ বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এছাড়া নেত্রকোণা-৩ আসনের বিএনপির সদস্য রফিকুল ইসলাম হিলালী মাদক নিয়ন্ত্রণে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বাড়ানো এবং রাজশাহী-৬ আসনের আবু সাঈদ চাঁদ মাদক নির্মূলে পুলিশ বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করার পরামর্শ দেন।ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এই বাজেট অধিবেশনে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও ক্ষমতাসীন জোটের মধ্যকার এই বিতর্ক দেশের গণতান্ত্রিক চর্চাকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। বিরোধী দল যেখানে ঋণের বোঝা ও চড়া মূল্যস্ফীতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে, অন্যদিকে সরকারি দল ও শরিকরা প্রান্তিক উন্নয়ন ও অর্থনীতির শক্তিশালীকরণের সপক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তবে ‘হ্যান্ডসাম’ এই বাজেট সাধারণ মানুষের ‘পেট খারাপের’ কারণ না হয়ে যেন প্রকৃত অর্থেই জনকল্যাণ বয়ে আনে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।


সিদ্ধিরগঞ্জে ডিএনডি লেকে গোসল করতে নেমে একই পরিবারের তিনজনের

সিদ্ধিরগঞ্জে ডিএনডি লেকে গোসল করতে নেমে একই পরিবারের তিনজনের