সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ তাআলার জন্য, যিনি মানবজাতির প্রকাশ্য শত্রু এবং তার গোমরাহী বা পথভ্রষ্ট করার ধরণ সম্পর্কে বান্দাদের সুস্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন; যেন মানুষ তার চিরশত্রুর কুপ্ররোচনা ও চক্রান্তের ব্যাপারে সদাসর্বদা সতর্ক থাকতে পারে। দয়াময় আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু, অতএব তাকে শত্রু হিসেবেই গ্রহণ করো।’ শয়তান মানুষের অন্তরে আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার জন্য ক্রমাগত কুপ্ররোচনা দিয়ে থাকে।
জ্ঞান অর্জন ও নেক আমলে বাধা দেয় শয়তান
আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দিতে শয়তানের প্রথম ও প্রধান কৌশল হলো মানুষকে দ্বীনি জ্ঞান অর্জন, নেক আমল এবং ইখলাস (কাজের একনিষ্ঠতা) অর্জনে বাধা দেওয়া। এসব ক্ষেত্রে শয়তানের প্ররোচনা থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো মহান আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে আশ্রয় প্রার্থনা করা এবং ‘আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ পাঠ করা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘যদি শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো প্ররোচনা তোমাকে প্ররোচিত করে, তবে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও।’
মিথ্যা ও পাপকে আকর্ষণীয় করে ফুটিয়ে তোলে
শয়তানের অন্যতম বড় চক্রান্ত হলো সে মানুষের সামনে মিথ্যা, বাতিল ও পাপ কাজকে অত্যন্ত চমৎকার ও আকর্ষণীয় করে ফুটিয়ে তোলে। কোরআনের বর্ণনায় শয়তান আল্লাহ তাআলার সামনে দম্ভোক্তি করে বলেছিল, ‘আমি অবশ্যই তাদের সামনে জমিনের বুকে পাপ কাজকে সুশোভিত করব এবং তাদের সকলকেই পথভ্রষ্ট করব।’ আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলেন, ‘শয়তান তাদের আমলগুলো তাদের সামনে সুশোভিত করে দেখিয়েছে এবং তাদেরকে সঠিক পথ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।’ শয়তান মানুষকে দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষা ও মিথ্যা আশার জালে আবদ্ধ করে রাখে।
অভাবের ভয় দেখানো ও সৃষ্টিকে বিকৃত করা
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেন, ‘শয়তান তোমাদের অভাব-অনটনের ভয় দেখায় এবং অশ্লীল কাজের আদেশ দেয়; আর আল্লাহ তোমাদের তাঁর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ শয়তান আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত করার এবং মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য সব দিক থেকে আক্রমণ করে। শয়তান বলেছিল, ‘আমি অবশ্যই তাদের সামনে থেকে, তাদের পেছন থেকে, তাদের ডান দিক থেকে এবং তাদের বাম দিক থেকে তাদের কাছে আসব; আর আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না।’ তখন আল্লাহ তাআলা শয়তানকে লাঞ্ছিত ও বিতাড়িত অবস্থায় বের করে দিয়ে বলেন, যারা শয়তানের অনুসরণ করবে, তাদের সবাইকে দিয়ে জাহান্নাম পূর্ণ করা হবে।
তাকওয়া ও আল্লাহকে স্মরণের মাধ্যমে মুক্তি
বিতাড়িত শয়তানের আধিপত্য কেবল তাদের ওপরই চলে না, যারা আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমার একনিষ্ঠ বান্দাদের ওপর তোমার কোনো আধিপত্য নেই; আর কর্মবিধায়ক হিসেবে তোমার রবই যথেষ্ট।’ আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে, যখন শয়তানের কোনো দল বা প্ররোচনা তাদের স্পর্শ করে, তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তৎক্ষণাৎ তাদের চোখ খুলে যায়।’
আমরা মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন শয়তানের সব রকম চক্রান্ত ও কুপ্ররোচনা থেকে আমাদের রক্ষা করেন। আল্লাহ আমাদের সব কাজের সঠিক দিশা দিন, আমাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করুন এবং আমাদের মন্দ আমল থেকে আমাদের হেফাজত করুন। আমীন।
আজকের এই পবিত্র জুমার দিনে শয়তানের চক্রান্তসংক্রান্ত খুতবার আলোচনাটি প্রতিটি মুসলিমের জীবনের জন্য এক মহা স্মারক। বর্তমানের বস্তুবাদী সমাজে শয়তান আমাদের অভাবের ভয় দেখিয়ে সুদের দিকে ধাবিত করে, আধুনিকতার নামে অশ্লীলতার আদেশ দেয় এবং প্রতিনিয়ত আল্লাহর সৃষ্টি ও বিধানকে বিকৃত করার প্ররোচনা জোগায়। শয়তানের এই চারমুখী (সামনে, পেছনে, ডানে, বামে) আক্রমণ থেকে বাঁচতে হলে আমাদের ওপরের ও নিচের দিক উন্মুক্ত রাখতে হবে—অর্থাৎ ওপরের দিকে আল্লাহর কাছে দুই হাত তুলে দোয়া করতে হবে এবং নিচের দিকে সিজদায় লুটিয়ে পড়তে হবে। খাঁটি তাকওয়া ও ইখলাসই পারে শয়তানের সব পাতানো জাল ছিন্ন করে আমাদের ঈমানকে সুরক্ষিত রাখতে।
ইসলামি ডেস্ক