স্বাস্থ্যখাতে টিকা অব্যবস্থাপনা ও রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেশব্যাপী এক নতুন জনস্বাস্থ্য উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। অভিযোগ উঠেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ১১টি রোগের সংশ্লিষ্ট টিকার তীব্র সংকট দেখা দেয়। এতে কেবল নিয়মিত টিকাদানই ব্যাহত হয়নি, বরং ১৫টি রোগের প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই অব্যবস্থাপনার ফলে সংক্রামক ও অসংক্রামক মিলিয়ে অন্তত ২৬টি রোগ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, শিশুদের শৈশবে সাতটি টিকার মাধ্যমে যক্ষ্মা (বিসিজি), নিউমোনিয়া (পিসিভি), হাম-রুবেলা (এমআর), টাইফয়েড (টিসিভি), ডায়রিয়া (রোটাভাইরাস ভ্যাকসিন) এবং পোলিওসহ (ওপিভি ও আইপিভি) মোট ১১টি রোগ প্রতিরোধ করা হয়। এছাড়া পেন্টাভ্যালেন্ট টিকার মাধ্যমে ডিপথেরিয়ার মতো আরও পাঁচটি মারাত্মক রোগের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, গত বছরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব টিকা প্রদানের কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে। দীর্ঘ সময় এই সেবা বন্ধ থাকায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতার ফলে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই সংকটের মূলে রয়েছে ‘অপারেশন প্ল্যান’ (ওপি) বন্ধ হওয়া। স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) আওতায় ১৯৯৮ সাল থেকে দেশে রোগ নিয়ন্ত্রণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের কার্যক্রম চলে আসছিল। গত বছরের জুনে চতুর্থ কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর জুলাইয়ে পঞ্চম কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও মার্চ মাসেই হঠাৎ ওপি বন্ধ করে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সংশ্লিষ্টদের দাবি, গত দুই বছরে মাত্র পাঁচটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে, যা পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে স্থবির করে দিয়েছে। এর ফলে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, ফাইলেরিয়া, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো ২৬টি রোগের প্রতিরোধ কার্যক্রম এখন প্রায় অকার্যকর।
টিকাদানের এই জটিলতা আরও প্রকট হয়েছে কেনার প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের কারণে। আগে গ্যাভি ও ইউনিসেফের মাধ্যমে দ্রুত টিকা কেনা হলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিজস্বভাবে কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে জটিলতা তৈরি হয়। পরে পুনরায় ইউনিসেফকে যুক্ত করা হলেও দীর্ঘসূত্রিতার কারণে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত টিকার সরবরাহ ঘাটতি থেকে যায়। ফলে বহু শিশু টিকার পূর্ণ ডোজ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী এই পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ার প্রভাব ইতোমধ্যে পড়তে শুরু করেছে এবং দেশে হামের বিস্তার দেখা যাচ্ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ না করলে সামনে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। শিশুমৃত্যুর হার কমানো এবং সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।
মাটি ও জনতার কথা রিপোর্ট