ঢাকা | | বঙ্গাব্দ

হাদি হত্যাকাণ্ডে ‘ভারতের সংশ্লিষ্টতার’ অভিযোগ: ইনকিলাব মঞ্চের মশাল মিছিল

হাদি হত্যাকাণ্ডে ‘ভারতের সংশ্লিষ্টতার’ অভিযোগ: ইনকিলাব মঞ্চের মশাল মিছিল ছবি: সংগৃহীত
ad728
আলোচিত ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে ‘ভারতের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার’ চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলে এর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও নেপথ্যের পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিতকরণের দাবিতে রাজধানী ঢাকায় মশাল মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে ভারতে আটকে থাকা পলাতক খুনিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জোর দাবি জানানো হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সন্ধ্যা ৭টায় রাজধানীর শাহবাগ মোড় থেকে ইনকিলাব মঞ্চের উদ্যোগে এই মশাল মিছিলটি শুরু হয়। মিছিলটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে টিএসসির রাজু ভাস্কর্য চত্বরে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়।

 ‘মুখ খুলো মমতা’ - রাজু ভাস্কর্যে ইনকিলাব মঞ্চের স্লোগান।
মশাল মিছিল চলাকালীন ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা ‘মুখ খুলো মমতা, জানতে চায় জনতা’, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস, জাস্টিস, জাস্টিস’ এবং ‘বাংলাদেশের আজাদী, ওসমান হাদি’ ইত্যাদি আকাশ কাঁপানো স্লোগানে রাজপথ মুখরিত করে তোলেন।

মিছিল শেষে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে আয়োজিত সমাবেশে ইনকিলাব মঞ্চের নেতৃবৃন্দ বর্তমান সরকারের তিন মাসের কার্যক্রম এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন:

মাসুদুর রহমান আদনান (কেন্দ্রীয় সদস্য): “এই সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পরেই ইনকিলাব মঞ্চকে আশ্বস্ত করেছিল যে তারা ওসমান হাদির বিচারের বিষয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। কিন্তু সরকারের তিন মাস অতিক্রম করার পরেও হাদি হত্যার তদন্ত বা খুনিদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করতে হলে এই স্পর্শকাতর হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।”

আব্দুল্লাহ আল জাবের (সদস্য সচিব): “গতকাল বুধবার আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এই বিষয়ে একটি মন্তব্য করেছেন। ব্যক্তিগতভাবে আমরা তাঁকে পছন্দ করলেও, তাঁর বক্তব্যে আমরা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের পক্ষে কোনো দৃঢ় অবস্থান দেখতে পাইনি। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এত বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি গোপন তথ্য ফাঁস করার পরেও আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিষয়টিকে হেলাফেলা করে আমলে নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও রহস্যজনক।”

তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, “কিছুদিন আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছিল ভারত ওসমান হাদির খুনিদের ফিরিয়ে দিতে রাজি হয়েছে। কিন্তু তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা কী? নাকি এই পুশব্যাক বা আইনি প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকাল ধরে ঝুলিয়ে রাখা হবে?”

ভারতের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির কাছে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা হারানোর প্রায় এক মাস পর, গত মঙ্গলবার (২ জুন) কলকাতায় এক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তৃণমূল নেত্রী ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক বিস্ফোরক দাবি করেন। তিনি প্রকাশ্যেই বলেন, বাংলাদেশে আগের বছরের একটি বড় হত্যাকাণ্ডের (হাদি হত্যা) আসামিদের পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তারের পর এই সংবেদনশীল বিষয়ে তাঁকে ‘সম্পূর্ণ চুপ থাকতে বলেছিলেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ’।

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রথম সারির গণমাধ্যমে মমতার এই বক্তব্যের ভিডিওচিত্র প্রচারিত হওয়ার পর থেকেই মূলত হাদি হত্যাকাণ্ডে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা বা কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিগত সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি বাংলাদেশে নতুন করে টক অব দ্য টাউন-এ পরিণত হয়।

“আকাশপাতাল বলে লাভ নেই, ওটা আমাদের আলোচনার বিষয় নয়” — পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
বুধবার (৩ জুন) সচিবালয়ে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতার এই বিস্ফোরক বক্তব্যের বিষয়ে সাংবাদিকরা দৃষ্টি আকর্ষণ করলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম তা তীব্রভাবে নাকচ করে দেন। তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন:

“আকাশপাতাল বলে তো লাভ নেই। পাশের দেশে একটা নির্বাচন হয়েছে, সেই নির্বাচনে একজন পরাজিত হয়েছেন। সেই পরাজিত একজন নেতা নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে একটা কথা বলেছেন, দ্যাট ইজ নট আওয়ার ম্যাটার টু ডিসকাস (ওটা আমাদের আলোচনার বিষয় নয়)।”

তিনি আরও যোগ করেন, “ভারত সরকার যদি এখন অফিশিয়ালি বাংলাদেশকে হাদি হত্যার ব্যাপারে কিছু বলে… অলরেডি তো এটা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কাজ চলছে, আইনি প্রক্রিয়া অনেকদূর এগিয়েছে। আমাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। হাদি হত্যার সুষ্ঠু বিচার আমরাও চাই এবং ভারতে যে খুনিরা ধরা পড়েছে, তাদেরকে দ্রুত দেশে ফেরত এনে এখানে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে আমরা সম্পূর্ণ সচেষ্ট আছি। এখন পাশের দেশের একজন পরাজিত নেত্রী তাঁর দেশের সরকারকে উদ্দেশ্য করে কী বললেন, তা নিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে মন্তব্য করা সমীচীন হবে বলে আমি মনে করি না।”

১২ ডিসেম্বর, ২০২৫: বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচনের বিতর্কিত তফসিল ঘোষণার ঠিক পরদিন দুপুরে রাজধানী ঢাকার বিজয়নগর পানির ট্যাংকির সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলিবিদ্ধ হন ইনকিলাব মঞ্চের প্রধান মুখ ওসমান হাদি।

১৮ ডিসেম্বর, ২০২৫: আশঙ্কাজনক অবস্থায় সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় হাদি মারা যান। তাঁর মৃত্যুর খবরে বাংলাদেশজুড়ে তীব্র বিক্ষোভ ও ভারতের বিরুদ্ধে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকাস্থ ভারতীয় হাই কমিশন এবং ভারতের অভ্যন্তরে থাকা বাংলাদেশী দূতাবাসের সামনে দফায় দফায় সংঘাতের ঘটনা ঘটে।

২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫: ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) দাবি করে, হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম ও তার সহযোগী মোটরসাইকেল চালক আলমগীর হোসেন ভারতের মেঘালয় রাজ্যে আত্মগোপন করে আছেন। তাদের সাহায্য করার অপরাধে দুই ভারতীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হলেও তৎকালীন ভারত সরকার সেসময় বিষয়টি স্বীকার করেনি।

৮ মার্চ, ২০২৬: দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর ভারতের পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে যে, প্রধান দুই সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম ও আলমগীরকে তারা গ্রেপ্তার করেছে। বর্তমানে তারা ভারতের একটি কারাগারে বন্দী রয়েছেন।

ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডটি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে একটি আবেগের জায়গা। ভারতের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো একজন শীর্ষ রাজনীতিক যখন সরাসরি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম জড়িয়ে এই খুনের আসামিদের আড়াল করার অভিযোগ তোলেন, তখন এটিকে কেবল ‘পাশের দেশের পরাজিত নেতার বক্তব্য’ বলে উড়িয়ে দেওয়া কূটনৈতিক দূরদর্শিতা হতে পারে না। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে অবিলম্বে ভারত সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে বন্দী আসামিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই খুনের নেপথ্যের মাস্টারমাইন্ডদের মুখোশ উন্মোচন করা।

সর্বশেষ সংবাদ
রামেক হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি: চিকিৎসাসেবা ব

রামেক হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি: চিকিৎসাসেবা ব