দেশে মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় মন্ত্রিসভা। নতুন এই আইনে গুম করার অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের কঠোর বিধান রাখা হয়েছে।
আর গুমের ফলে যদি আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে, মরদেহ উদ্ধার হয় অথবা ৫ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও উক্ত ব্যক্তিকে জীবিত বা মৃত উদ্ধার করা সম্ভব না হয়—তবে সে ক্ষেত্রে দায়ী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা আদায়ের বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
গতকাল সোমবার (৩ আগস্ট) বিকেলে বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্ব অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার ১৫তম বৈঠকে এই ঐতিহাসিক অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হয়।
১২০ দিনে তদন্ত ও ১২০ দিনে বিচার নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা
আইনটিতে দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর কঠোর সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে:
দ্রুত তদন্ত ও বিচার: মামলার তদন্ত সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে এবং পরবর্তীতে ট্রাইব্যুনালে বিচারকাজ পরবর্তী ১২০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
অনুপস্থিতিতে বিচার ও ডিজিটাল সাক্ষ্য: গুম হওয়া ব্যক্তিকে দ্রুত উদ্ধারে আদালতের মাধ্যমে বিশেষ তল্লাশি পরোয়ানা জারি, অভিযুক্ত ব্যক্তি আত্মগোপনে থাকলেও তার অনুপস্থিতিতে বিচারকাজ চালানো এবং আধুনিক ডিজিটাল সাক্ষ্যের পূর্ণ গ্রহণযোগ্যতার বিধান আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীর পরিবারের অধিকার, ‘গুম সনদ’ ও সম্পত্তি বণ্টন
গুমের শিকার পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর করতে আইনে বেশ কিছু অনন্য প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে: ১. তথ্য পাওয়ার অধিকার: গুম হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত অবস্থান, তদন্তের অগ্রগতি ও পরিণতি জানার আইনি অধিকার পাবে তাঁর পরিবার। ২. ক্ষতিপূরণ তহবিল: দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি বাজয়াপ্ত করে ভুক্তভোগী পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে; তা সম্ভব না হলে রাষ্ট্র কর্তৃক গঠিত বিশেষ তহবিল থেকে সরকারি আইনগত সহায়তা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। ৩. গুম সনদ ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা: গুম হওয়া ব্যক্তির স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণের জন্য তাঁর অর্জিত সম্পত্তি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া যাবে। আর টানা ৫ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া না গেলে আদালত কর্তৃক ‘গুম সনদ’ (Disappearance Certificate) ইস্যু করা হবে, যার ভিত্তিতে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে আইনানুযায়ী সম্পত্তি বণ্টনের সুযোগ তৈরি হবে।
আইনটিতে সাক্ষী, অভিযোগকারী, তথ্য প্রকাশকারী ও ভুক্তভোগীদের সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো যুক্ত করা হয়েছে।
বিগত বছরগুলোতে গুম ও জোরপূর্বক নিখোঁজের ঘটনাগুলো বাংলাদেশের মানবাধিকার সূচকে একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে ছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভায় পাস হওয়া ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ কেবল একটি আইন নয়, বরং এটি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের কান্নার আইনি স্বীকৃতি। ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত ও বিচার শেষ করার এই বিধান যদি আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত হয়ে বাস্তবায়িত হয়, তবে রাষ্ট্রযন্ত্রের কোনো সংস্থা বা প্রভাবশালীদের দিয়ে গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের পথ চিরতরে বন্ধ হবে।
স্টাফ রিপোর্টার