ঢাকার মুগদায় পলিথিন ও বস্তাবন্দী অবস্থায় উদ্ধার হওয়া খণ্ডিত মরদেহের রহস্য উদঘাটন করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব). সংস্থাটি জানিয়েছে, পরকীয়া সম্পর্কের জেরে প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে এসে নৃশংসভাবে খুনের শিকার হয়েছেন মোকাররম মিয়া (৩৮) নামে এক সৌদি প্রবাসী. এই ঘটনায় এক নারী ও তার ১৩ বছরের নাবালিকা মেয়েকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে.
আজ সোমবার (১৮ মে) বিকেলে র্যাব-৩ সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন স্কোয়াড্রন লিডার মো. সাইদুর রহমান.
নিহত ও গ্রেপ্তারকৃতদের পরিচয়:
নিহত ব্যক্তি: মোকাররম মিয়া (৩৮), বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার তালশহরে. তিনি সম্প্রতি সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরেন.
গ্রেপ্তারকৃতরা: হেলেনা বেগম এবং তার ১৩ বছর বয়সি মেয়ে. (মুগদার মান্ডা এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়).
পলাতক মূল অভিযুক্ত: তাসলিমা আক্তার, নিহতের পরকীয়া প্রেমিকা ও আরেক প্রবাসীর স্ত্রী.
যেভাবে হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত:
র্যাব জানায়, নিজ এলাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেই তাসলিমা আক্তারের সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন প্রবাসী মোকাররম. গত ১৩ মে তিনি সৌদি আরব থেকে ঢাকা এয়ারপোর্টে নেমে সরাসরি নিজ বাড়িতে না গিয়ে মুগদার মান্ডায় তাসলিমার বান্ধবী হেলেনার ভাড়া বাসায় ওঠেন. মোকাররমের আসার খবর পেয়ে তাসলিমাও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ওই বাসায় আসেন.
এক কক্ষের ওই বাসায় অবস্থানকালে তাদের মধ্যে আর্থিক লেনদেন এবং ‘আপত্তিকর’ ছবি-ভিডিও ধারণের বিষয় নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়. তাসলিমা বিয়ে করতে রাজি না হওয়ায় মোকাররম তার দেওয়া ৫ লাখ টাকা ফেরত চান এবং আপত্তিকর ছবি-ভিডিও ফাঁস করার হুমকি দেন. পাশাপাশি হেলেনার অভিযোগ, মোকাররম তার নাবালিকা মেয়েকে ধর্ষণের চেষ্টাও করেছিলেন.
খাবারে ঘুমের ওষুধ, হাতুড়ি-বটি দিয়ে হত্যা:
র্যাব কর্মকর্তা জানান, ব্ল্যাকমেইলিং ও উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে তাসলিমা ও হেলেনা মিলে মোকাররমকে হত্যার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেন.
১৪ মে সকাল: মোকাররমের খাবারের সঙ্গে অতিরিক্ত মাত্রায় ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেওয়া হয়.
হত্যাকাণ্ড: প্রথমে তাকে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়. মোকাররমের আংশিক চেতনা থাকায় ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে সবাই মিলে হাতুড়ি ও বটি দিয়ে উপুর্যপুরি আঘাত করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন.
লাশ খণ্ডবিখণ্ড: মৃত্যুর পর মরদেহ বাথরুমে নিয়ে ধারালো বটি দিয়ে কেটে আট টুকরো করা হয়.
হত্যাকাণ্ড লুকানোর জন্য রাতে লাশের টুকরোগুলো পলিথিন ও বস্তায় ভরে বাসার কাছের একটি আবর্জনার স্তূপে ফেলে দেওয়া হয় এবং মাথাটি ফেলা হয় অনেক দূরে. ঘটনার পরদিন নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখাতে তারা বাসার ছাদে আড্ডা এবং বিশেষ খাবারের আয়োজনও করেন.
দুই দিন পর গত রোববার (১৭ মে) আবর্জনার স্তূপ থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ালে স্থানীয়রা জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল দেয়. পুলিশ এসে খণ্ডিত দেহাংশ উদ্ধার করার পর আঙুলের ছাপ (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) নিয়ে নিহতের পরিচয় নিশ্চিত করে. পরবর্তীতে রোববার রাতেই র্যাব অভিযান চালিয়ে হেলেনা ও তার মেয়েকে গ্রেপ্তার করে এবং তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিহতের বিচ্ছিন্ন মাথাটি উদ্ধার করে.
পরকীয়া ও অনৈতিক সম্পর্কের করুণ পরিণতি এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড. ঘটনায় জড়িত প্রধান অভিযুক্ত তাসলিমা আক্তারকে গ্রেপ্তারে র্যাবের অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানানো হয়েছে.
স্টাফ রিপোর্টার