টানা পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা ভয়াবহ পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের দক্ষিণ অঞ্চলের বেশ কয়েকটি উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি উপচে এবং বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় অন্তত সাড়ে চার লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে চরম মানবিক সংকটের মুখে পড়েছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা এই ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির তথ্য নিশ্চিত করেছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসনের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।
ডলুর বাঁধ ভেঙে সাতকানিয়া পুরোপুরি পানির নিচে: পানিবন্দী ৩ লাখ লোক
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালীর বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ও নজিরবিহীন ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সাতকানিয়া উপজেলায়।
সাতকানিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান জানান, উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রতিটি গ্রাম এখন পানির নিচে। ডলু নদীর বাঁধ ভেঙে পৌরসভা ও রামপুর এলাকায় তীব্র গতিতে পানি প্রবেশ করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাইরে চলে গেছে। সব মিলিয়ে শুধু সাতকানিয়াতেই অন্তত তিন লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন।
উপজেলায় ৮৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও মোবাইল নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বিপর্যস্ত হওয়ায় দুর্গত এলাকার মানুষের সাথে যোগাযোগ ও বিস্তারিত তথ্য পেতে বেগ পেতে হচ্ছে। ঝড়ে গাছ পড়ে তার ছিঁড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। উদ্ধারকাজে গতি আনতে জরুরি ভিত্তিতে ১০টি স্পিডবোট চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
বিপৎসীমার ওপরে সাঙ্গু নদী: বাঁশখালী, চন্দনাইশ ও লোহাগাড়ার চিত্র
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সাঙ্গু নদী, ডলু ও হাঙ্গর খালের মাধ্যমে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, সাঙ্গু নদীর দোহাজারী অংশে পানি বিপৎসীমার ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
বাঁশখালী: উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ওমর সানি আঁকন জানান, ১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে পুঁইছড়ি, নাপোড়া, ছনুয়া, সরল, শেখের খীল, বৈলছড়ী ও কাথারিয়া ইউনিয়নের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। এই উপজেলায় অন্তত ৩৮ হাজার মানুষ পানিবন্দী রয়েছেন।
চন্দনাইশ: ইউএনও আবদুর রহমান জানান, হাশিমপুর ও জোয়ারা ছাড়া সবকটি ইউনিয়ন কমবেশি দুর্গত হয়েছে। এতে প্রায় ১৪ হাজার লোক পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।
লোহাগাড়া: ইউএনও বায়েজিদ বিন আখন্দ জানান, নয়টি ইউনিয়নের মধ্যে সাঙ্গু ও ডলু নদী সংলগ্ন আমিরাবাদ, আধুনগর, পদুয়া ও লোহাগাড়া ইউনিয়নে পানি বেশি উঠেছে। এর মধ্যে আমিরাবাদ ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বৃষ্টি কিছুটা কমলেও কমেনি ভোগান্তি, ত্রাণ বরাদ্দ
গত রোববার (৫ জুলাই) থেকে টানা পাঁচ দিন ধরে চট্টগ্রামে মুষলধারে বৃষ্টি হলেও গতকাল বৃহস্পতিবার বৃষ্টির পরিমাণ কিছুটা কমেছে। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস ২২৩ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে। তবে ভাটি অঞ্চলে পানি বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমেনি।
বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়াতে সরকারি তৎপরতা শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ইতিমধ্যে ২০০ মেট্রিক টন চাল এবং ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ তহবিল থেকে আরও ২০ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। দুর্গত মানুষ যাতে খাদ্যসংকটে না পড়ে, সে জন্য ইউএনওদের চাহিদার ভিত্তিতে এসব শুকনো খাবার ও ত্রাণ দ্রুত বিতরণ করা হচ্ছে।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের এই আকস্মিক বন্যা আবারও মনে করিয়ে দিল যে, পাহাড়ি ঢল ও নদীগুলোর নাব্যতা সংকট আমাদের জন্য কতটা মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে। ডলু নদীর বাঁধ ভেঙে সাতকানিয়ার ৩ লাখ মানুষ বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্কহীন অবস্থায় অন্ধকারের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে—এটি চরম উদ্বেগের। সরকারি স্পিডবোট আসার অপেক্ষায় না থেকে সেনাবাহিনী, কোস্টগার্ড এবং স্থানীয় যুবসমাজকে সাথে নিয়ে দ্রুত উদ্ধারকাজ জোরদার করা উচিত। সরকারি বরাদ্দের পাশাপাশি দেশের বিত্তবান ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান, এই মুহূর্তে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও জরুরি ওষুধ নিয়ে চাটগাঁর বানভাসি মানুষের পাশে এসে দাঁড়ান।
নিজস্ব প্রতিবেদক