ঢাকা | | বঙ্গাব্দ

জুলাইয়ের ডায়েরি

জুলাইয়ের ডায়েরি ছবি: সংগৃহীত
ad728

১৯শে জুলাইয়ের সেই দিনগুলো নিয়ে কিছু কথা.....
​১৯শে জুলাই ২০২৪। ক্যালেন্ডারের পাতায় আজকের দিনটি অনেকের কাছে সাধারণ মনে হলেও, আমার কাছে এটি এক বিভীষিকাময় যুদ্ধের দিন। সেই শুক্রবারের সকাল থেকেই বাতাসে ছিল বারুদের গন্ধ আর আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ভাইয়ের কর্মসূচিতে অংশ নিতে প্রেসক্লাব অভিমুখে যাত্রা শুরু করেছিলাম।
​ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সহযোদ্ধাদের নিয়ে জুমার নামাজ আদায় করে যখন প্রেসক্লাবের দিকে এগোচ্ছিলাম, তখনো জানতাম না কী ভয়াবহতা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। বিজয়নগর পানির টাংকি এলাকা—সেখানে পৌঁছাতেই পুলিশের অতর্কিত গুলিবর্ষণ শুরু হলো। নিমিষেই চারপাশ পরিণত হলো এক রণক্ষেত্রে।
​আমার চোখের সামনেই ঝরে গেল তাজা প্রাণ। আমার পাশেই থাকা এক যুবদল নেতা হঠাৎ লুটিয়ে পড়ল। গুলির আঘাতে তার মগজ ঝরে গিয়েছিল—সেই বীভৎস দৃশ্য আজো আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আমরা কয়েকজনে মিলে তার নিথর দেহটা ধরাধরি করে একটি রিকশায় তুলেছিলাম। সেই রক্তমাখা হাত আর প্রিয় সহযোদ্ধার বিদায়—সেদিনের সেই কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।


​প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে সেই মরণপণ লড়াই চলল। কিন্তু থামিনি। এরপরই আমার গন্তব্য ছিল নয়াপল্টন। স্বৈরাচারী শাসকের পুলিশের ডিবি হারুন বাহিনী তখন পার্টি অফিসের দরজায় তালা ঝুলিয়ে রেখেছিল। কিন্তু আমাদের কণ্ঠস্বর কি তালা দিয়ে আটকানো যায়? আমি নিজ হাতে সেই তালা ভেঙেছিলাম। আমার হাতের কাঁপুনি ছিল না, ছিল কেবল এক অদম্য জেদ—পার্টি অফিসকে মুক্ত করার জেদ। যখন তালাটা ভেঙে গেল, মনে হলো আমরা যেন দীর্ঘদিনের শিকল ভেঙে বেরিয়ে এলাম।
​স্বৈরাচারী হাসিনার পেটোয়া বাহিনী সেদিন অকাতরে ছাত্র ও জনতার রক্ত ঝরিয়েছিল। চারিদিকের আর্তনাদ, পুলিশের গুলি আর মৃত্যুর মিছিলের মাঝে আল্লাহ অশেষ রহমতে আমাকে সেদিন বাঁচিয়ে রেখেছেন। আজও যখন একা হই, ১৯শে জুলাইয়ের সেই পল্টনের রাস্তাগুলো আমাকে তাড়া করে ফেরে। সেই রক্তস্নাত শহীদদের আত্মা কি আজ মুক্তি পেয়েছে? আমি জানি না। কিন্তু আমি গর্বিত—আমি লড়াই করেছি, আমি তালা ভেঙেছি, আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছি।
​আজ ১৯শে জুলাই। সেই দিনের প্রতিটি রক্তবিন্দু আমার শপথকে আরো দৃঢ় করে। আমরা লড়েছিলাম বেঁচে থাকার জন্য, লড়েছিলাম মিথ্যার শিকল ভাঙার জন্য। আজকের দিনে সেই শহীদদের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
যখন মিরপুরের রাস্তাগুলো উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল, তখন পুরো দেশ যেন এক আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। গুলির শব্দ, মানুষের আর্তনাদ আর ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে ঢাকা পড়েছিল আকাশ। আজ যখন পেছনের দিকে তাকাই, মনে হয় সেই মুহূর্তগুলো ছিল মৃত্যুর সাথে জীবনের এক অসম লড়াই।
​আমি যখন মিরপুরের সেই রাজপথে দাঁড়িয়েছিলাম, আমার চারপাশে তখন কেবল বারুদ আর আতঙ্কের গন্ধ। আমাদের শরীরের প্রতিটি ক্ষতচিহ্ন আজ সেই কষ্টের সাক্ষী হয়ে আছে। কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার নেতৃত্বের পেছনে কোনো ব্যক্তিগত চাওয়া ছিল না; ছিল কেবল ন্যায়ের প্রতি অগাধ বিশ্বাস। আমি জানি, সেদিন যদি আমি আমার সহযোদ্ধাদের সামনে শক্ত হাতে নেতৃত্ব না দিতাম, তবে হয়তো আজকের এই নতুন দিনের সূর্য আমাদের জন্য উদিত হতো না। ইতিহাসের পাতাগুলো হয়তো অন্য কোনো হতাশার গল্প লিখত।

​সবচেয়ে কষ্টের জায়গাটা ঠিক ওখানেই। যখন আমাদের ভাইয়েরা রাস্তায় জীবন দিচ্ছে, তাদের রক্তে রাজপথ ভিজে যাচ্ছে—তখন সেইসব তথাকথিত 'হাইব্রিড' নেতারা তাদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের চার দেয়ালের আড়ালে বসে ছিলেন। তারা আমাদের শরীরের ক্ষতগুলোকে দূর থেকে এক ধরনের বিকৃত তামাশা হিসেবে উপভোগ করছিলেন।
​তাদের এই নীরবতা বা উদাসীনতা ছিল গুলির চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। তারা কখনো বুঝতে পারবে না জুলাইয়ের ওই দিনগুলো কতটা কষ্টের ছিল, কত রাত আমরা না খেয়ে, খোলা আকাশের নিচে মৃত্যুর প্রতীক্ষায় কাটিয়েছি। তাদের কাছে এটা ছিল রাজনীতির চাল, কিন্তু আমাদের কাছে ছিল অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
​জুলাইয়ের সেই স্মৃতি কোনো সাধারণ গল্প নয়। এটি একটি প্রজন্মের আর্তনাদ, যা আজ ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। আমরা যারা সেদিন বুক পেতে দিয়েছিলাম, তারা কোনো পদক বা স্বীকৃতির জন্য লড়িনি। লড়েছিলাম একটি স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকারের জন্য।
​মিরপুরের মাটি আজও সেই লড়াইয়ের সাক্ষী। আজ যখনই আমি সেই দিনগুলোর কথা ভাবি, তখন বুকের ভেতর এক অদ্ভূত শূন্যতা তৈরি হয়—সেই সব সাথীদের জন্য যারা আর আমাদের মাঝে নেই, যারা সেই কষ্টের গল্পটা আর কখনো বলে যেতে পারবে না। আমরা টিকে আছি ঠিকই, কিন্তু আমরা জানি জুলাইয়ের সেই কষ্ট কখনো পুরনো হয় না; তা কেবল সময়ের সাথে মিশে আমাদের লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা হয়ে রয়ে যায়।



২৪ জুলাই 
আন্দোলন এতোটা সহজ ছিলো না। রক্তের স্রোত ও অকথ্য কষ্টের গভীর দিনগুলোর কথা।
​২০২৪ সালের জুলাই মাসের দিনগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছে, যা সহজে মুছে যাওয়ার নয়। ওপর থেকে হয়তো আন্দোলনকে কেবল কিছু স্লোগান, রাজপথের জমায়েত বা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের একটি ধাপ হিসেবে দেখা যায়; কিন্তু এর অন্তর্স্থলে রয়েছে বুকফাটা কান্না, স্বজন হারানোর বেদনা এবং অকথ্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের এক রোমহর্ষক ইতিহাস। 

​অসম লড়াই এবং চরম প্রাণঘাতী দমনপীড়ন
​একটি যৌক্তিক ও সাধারণ দাবি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন যখন চতুরতার সাথে রাষ্ট্রযন্ত্র দ্বারা দমন করার চেষ্টা করা হয়, তখন পরিস্থিতি রূপ নেয় চরম রক্তপাতে।
​খালি হাতে রাজপথে দাঁড়ানো শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে সাঁজোয়া যান, হেলিকপ্টার থেকে গুলি এবং প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার করা হয়েছিল। এই অসম লড়াইয়ে নিরস্ত্র মানুষের পক্ষে টিকে থাকা এবং বেঁচে থাকা কোনোভাবেই সহজ ছিল না।
গুলিতে নিহতদের তালিকায় কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বা তরুণরাই ছিল না, ছিল বারান্দায় খেলতে থাকা শিশু, রিকশাচালক এবং খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। এই নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ পুরো জাতিকে এক গভীর ট্রমার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল।
​যোগাযোগ ব্ল্যাকআউট ও চরম অনিশ্চয়তা ​সেদিনের ভয়ংকর দিনগুলোর অন্যতম বড় কষ্ট ছিল তথ্য মহাশূন্যতা বা ব্ল্যাকআউট। ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দিয়ে সারা দেশকে একরকম বিচ্ছিন্ন দ্বীপ বানিয়ে ফেলা হয়েছিল।
​ঢাকা বা দেশের অন্যান্য প্রান্তের রাজপথে যখন রক্তগঙ্গা বইছে, তখন দূরদূরান্তের মায়েরা জানেন না তাদের সন্তান জীবিত আছে কি না। এই অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ এবং প্রিয়জনের সন্ধানে হাসপাতালের মর্গে মর্গে ঘুরে বেড়ানোর যে মানসিক যন্ত্রণা, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। হাসপাতালের করিডোর ও চিকিৎসকদের অসহায়ত্ব
​জুলাইয়ের দিনগুলোতে দেশের হাসপাতালগুলোর চিত্র ছিল নরকের মতো।
​ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ অন্যান্য হাসপাতালের জরুরি বিভাগগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। একের পর এক গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত শরীর নিয়ে আসা হচ্ছিল। চিকিৎসকরা হিমশিম খাচ্ছিলেন এত আহত মানুষের জীবন বাঁচাতে। অক্সিজেনের অভাব, রক্তের সংকট এবং স্বজনদের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। চোখের সামনে তরুণ যুবকদের নিথর হয়ে যাওয়ার দৃশ্য চিকিৎসকদের মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল।
​এই আন্দোলনের পর দেশের প্রতিটি ঘরে যে ট্রমা তৈরি হয়েছে, তার রেশ আজও কাটেনি।
​যেসব মা তাদের সন্তানকে সকালে হাসিমুখে বিদায় দিয়েছিলেন, সন্ধ্যায় তাদের লাশ বুঝে নিতে হয়েছে—তাদের এই শূন্যতা কোনো সান্ত্বনা দিয়ে পূরণ হওয়ার নয়।
​যারা পঙ্গুত্ববরণ করেছেন, চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন, তাদের সারা জীবনের এই অক্ষমতা এক নির্মম কষ্টের স্মারক হয়ে বেঁচে আছে।

​২৪ জুলাই আন্দোলন কেবল একটি সফলতার গল্প নয়; এটি আত্মত্যাগ, কান্না এবং রক্তের কালিতে লেখা এক মহাকাব্য। এটি এতোটা সহজ ছিল না কারণ এর প্রতিটি পঙক্তি রচিত হয়েছে তাজা প্রাণের বিনিময়ে। ইতিহাসের এই নির্মম অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অধিকার আদায়ের পথ কতোটা কন্টকাকীর্ণ এবং বেদনাদায়ক হতে পারে।
-----
সাজ্জাদুল মিরাজ 
সদস্য সচিব 
যুবদল, ঢাকা মহানগর উত্তর


সর্বশেষ সংবাদ
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্ব: সৌদি যুবরাজকে শি জিনপিংয়ের ফোন

আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্ব: সৌদি যুবরাজকে শি জিনপিংয়ের ফোন